
নজরুল তাঁর দীনতাকে খুব তুচ্ছ করে দেখেছিলেন, কারণ তিনি ছিলেন একজন প্রকৃত যোদ্ধা। একদিকে যুদ্ধ করেছেন দারিদ্র্যের সঙ্গে, পাশাপাশি যুদ্ধ করেছেন সামাজিক দৈন্যদশার বিরুদ্ধে, ধর্মান্ধতার বিরুদ্ধে। মনে-প্রাণে ধার্মিক এই মানুষটি বিচরণ করেছেন মানবিকতার নানা শাখায়, যেখানে ধর্মীয় মৌলবাদ কবিকে এতটুকুও বাঁধতে পারেনি।
তাই তো শ্রীকৃষ্ণের লীলার মানবিক প্রেম-উৎসব তিনি বাঙালি হিসেবে রসবোধ দিয়ে উপভোগ করেছেন মনভরে। আবার নীলবর্ণা শ্যামার তন্বীর মাঝে খুঁজে পেয়েছেন সন্তানদের জন্য স্নেহময়ী মায়ের জীবনসংগ্রাম। জীবনের এমন ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নানা উপলব্ধিই তাঁর লেখাকে সমৃদ্ধ করেছে। কবি নিজেও ছিলেন তেমন একজন যোদ্ধা, যিনি তাঁর কবিতায় দ্রোহের আগুন জ্বেলে রেখেছেন।
কবি ইসলামের কূপমণ্ডূকতাকে রুখে দিতে হাদিস-কোরআনের ওপর আহরিত তাঁর জ্ঞান যে শুধু চর্বিতচর্বণ ছিল না, ছিল না অন্ধের হাতি দেখার শখ—তা তৎকালীন কাঠমোল্লা সমাজকে বুঝিয়ে দিতে পুরো আমপারা বাংলা অনুবাদ করলেন। পবিত্র কোরআন-হাদিসের সুন্দর দিকগুলো থেকে লিখলেন হামদ, নাতে রাসুল। পারস্যের বিখ্যাত কবি ওমর খৈয়ামের লেখা অনুবাদ করলেন ‘রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম’।
কবি ছিলেন সাম্যের কবি, দ্রোহের কবি। আর সবচেয়ে বড় যে সত্য—কবি এসে দাঁড়িয়েছিলেন দরিদ্র ও শোষিত মানুষের কাতারে।
আজ কবিকে নিয়ে রাজনীতিকরণের ধুম লেগেছে। একটি বিদ্রোহী কবিতা উপজীব্য হচ্ছে স্লোগানে, ঝাঁঝালো মিছিলের জ্বালাময়ী ভাষণে। অথচ ‘অগ্নিবীণা’ কাব্যগ্রন্থের প্রায় সব কবিতাই পড়লে দেখা যায়, কোনোটিই দেহে আগুন জ্বালায় না—বরং জীবন ও মানবতার নানা রূপ সেখানে ধরা দিয়েছে। জীবন-রসবোধের মধ্য দিয়ে কবি তাঁর প্রায় সব লেখায় মানুষকে বোঝাতে চেষ্টা করে গেছেন—‘আমি কবি, আমি মানুষ এবং এই পৃথিবীতে মানুষ হয়ে বেঁচে থাকাটাই বড় জরুরি।’
আজ কবি বেঁচে থাকলে মুচকি হেসে নিশ্চিত বলতেন, ‘ধুইয়ো লাশ আমার লাল পানি দিয়ে।’ কে জানে, তেলের এই যুগে কোন রাজনৈতিক দল কবিকে লুফে নিতে চাইত! আমি নিশ্চিত, কবির মৃতদেহ সব ‘রেড ওয়াইন’ দিয়ে গোসল করাত, নাহয় কবির মাজারে ফুলের বদলে সরাবের বোতল রেখে কবরে দাঁড়িয়ে গাইত—‘খোদার প্রেমে সরাব পিয়ে বেহুশ হয়ে রই পড়ে হায়।’
তবে মোল্লাতান্ত্রিক এই সমাজ একদিন তা করতেও পারে—মৃত কবিকে দলে ভেড়ানো নিয়ে কথা। ভাগ্যিস, সনাতনবাদীদের কোনো দল এ দেশে নেই। থাকলে তারাও শ্যামার সন্তান বলে তাঁর জন্মদিন পালন করত, ত্রি-সুর নিয়ে ঘুরে বেড়াত। যাক, এ যাত্রা বেঁচে গেলে অদূর ভবিষ্যতে কী হয়, তা বলা যায় না।
ইসকন-উপাস্যদের মাঝে নজরুল যেদিন ঢুকে গিয়ে দল ভারী করতে সক্ষম হবেন, সেদিন একদিকে একদল ‘খেপেছেন দামাল ছেলে কামাল ভাই’ বলে খোলা তরবারি নিয়ে ছুটে আসবে, আর ওরাও নাড়া তুলবে—‘মেঘের ডমরু ঘন বাজে।’
কবিকে একঘরে করে রাখতে এই কাঠমোল্লারা একদিন তাঁকে নাস্তিক বলতে এতটুকুও ছাড় দেয়নি। এমন ষড়যন্ত্রকারী কাঠমোল্লা সমাজ—যারা আজ নজরুলকে আস্ত মুসলিম কবি বানানোর চেষ্টায় ঘাম ঝরাচ্ছেন—তারাই একসময় কবিকে অমুসলিম বলে, কবি হাফিজকে তাঁদের কবি বলে গুণকীর্তন করত। চরম অবহেলায় কাজী নজরুল ইসলামকে ধর্মীয় মৌলবাদীরা নাস্তিক বলে তিরস্কার করত।
এক সংবর্ধনা সভায় নজরুল বলেছিলেন, ‘কবি হতে আমি আসিনি, আপনারা আমাকে কবি বানিয়েছেন।’ সেই ‘আপনারা’ কোনো রাজনৈতিক একক দল বা গোষ্ঠী নয়; এককথায়, তাঁরা সকলেই সাধারণ মানুষ।
**অহিদুজ্জামান রানা**
সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী