
বাংলাদেশে প্রতিবছর সাপের কামড়ে বহু মানুষের মৃত্যু হলেও জীবনরক্ষাকারী অ্যান্টিভেনম তৈরির জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত সাপের বিষ (ভেনম) সংগ্রহে এখনো বিদেশের ওপর নির্ভর করতে হয়। এ নির্ভরতা কমানোর সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে পটুয়াখালীর একটি বাণিজ্যিক স্নেক ভেনম ফার্মকে ঘিরে। তবে সরকারি নিবন্ধন পাওয়ার পরও ভেনম প্রক্রিয়াজাতকরণ ও শিল্প পর্যায়ে ব্যবহারের প্রয়োজনীয় অবকাঠামো না থাকায় উদ্যোগটি এখনো পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত হয়নি।
উদ্যোক্তার দাবি, প্রয়োজনীয় অনুমোদন, প্রযুক্তিগত সহায়তা ও ওষুধ শিল্পের অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে খামারটির বিষধর সাপ থেকে প্রতি মাসে প্রায় ৮ কোটি টাকা মূল্যের ভেনম উৎপাদনের সম্ভাবনা রয়েছে। এসব ভেনম অ্যান্টিভেনমসহ বিভিন্ন গবেষণা ও ওষুধ তৈরির কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহার করা যেতে পারে। এতে বিদেশ থেকে কাঁচামাল আমদানির নির্ভরতা কমার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রা সাশ্রয়ের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।
পটুয়াখালী সদর উপজেলার মাদারবুনিয়া ইউনিয়নের নন্দীপাড়া গ্রামের বাসিন্দা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস ২০০০ সালে সৌদি আরবের প্রবাসজীবন শেষে দেশে ফিরে ব্যক্তিগত উদ্যোগে ‘বাংলাদেশ স্নেক ভেনম’ নামে খামারটি প্রতিষ্ঠা করেন।
তিনি ২০০৮ সালে প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয়ে খামারের নিবন্ধনের আবেদন এবং ২০১৮ সালে পরিবেশগত ছাড়পত্রের জন্য আবেদন করেন। দীর্ঘ প্রায় ২৬ বছর পর সম্প্রতি প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তর থেকে বিষধর সাপের ভেনম সংগ্রহের নিবন্ধন পান বলে জানান তিনি।
বর্তমানে খামারটিতে কালো গোখড়া, খইয়া গোখড়া, কিং কোবরা, কালকেউটে, অজগরসহ বিভিন্ন প্রজাতির প্রায় ৩০০টি সাপ রয়েছে বলে উদ্যোক্তা দাবি করেন।
প্রতিদিন দেশের বিভিন্ন এলাকা থেকে দর্শনার্থীরা খামারটি দেখতে আসেন। তাঁদের অনেকে বলেন, দেশে এ ধরনের উদ্যোগ বিরল। সরকারি সহায়তা পেলে এটি গবেষণা, ওষুধ শিল্প এবং কর্মসংস্থানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
স্থানীয় কয়েকজনের ভাষ্য, ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন ধরে খামারটি পরিচালিত হলেও আর্থিক সংকটের কারণে এটি টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়েছে। তারা মনে করেন, সরকারি সহায়তা ও বেসরকারি ওষুধ কোম্পানিগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে উদ্যোগটি দেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদে পরিণত হতে পারে।
খামারের কর্মীরাও জানান, আর্থিক সংকটের মধ্যেও তারা কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। তাদের প্রত্যাশা, প্রয়োজনীয় সহযোগিতা পেলে খামারটি নিয়মিতভাবে পরিচালিত হবে এবং নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
উদ্যোক্তা আব্দুর রাজ্জাক বিশ্বাস বলেন, ব্যক্তিগত জীবনে একের পর এক পারিবারিক শোক এবং দীর্ঘদিনের আর্থিক সংকটের কারণে খামারটি পরিচালনা করা কঠিন হয়ে পড়েছে। কর্মীদের নিয়মিত বেতন দিতেও হিমশিম খেতে হচ্ছে।
তিনি বলেন, “লাইসেন্স পাওয়ার পর এখন ভেনম সংগ্রহ, সংরক্ষণ, আন্তর্জাতিক প্রশিক্ষণ এবং ওষুধ শিল্পের উপযোগী কাঁচামাল তৈরির জন্য আরও অনেক কাজ করতে হবে। কিন্তু প্রয়োজনীয় অর্থের অভাবে এগোতে পারছি না।”
তিনি আরও বলেন, সরকারি সহযোগিতা এবং ওষুধ প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর অংশগ্রহণ নিশ্চিত হলে দেশে অ্যান্টিভেনম উৎপাদনের নতুন সম্ভাবনা তৈরি হবে। এতে বিদেশ থেকে ভেনম আমদানির প্রয়োজন কমবে এবং দেশের ওষুধ শিল্পও উপকৃত হবে।
পটুয়াখালী জেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ডা. মো. হাবিবুর রহমান বলেন, খামারটিকে ভেনম সংগ্রহের জন্য নিবন্ধন দেওয়া হয়েছে। তবে সংগৃহীত ভেনম সরাসরি বাজারজাত করা যাবে না।
তিনি বলেন, “নির্ধারিত মান বজায় রেখে প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদিত ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে ভেনম ওষুধ শিল্পে ব্যবহার করা যাবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, সাপের বিষ শুধু অ্যান্টিভেনম উৎপাদনেই নয়, বিভিন্ন জটিল রোগের ওষুধ উদ্ভাবন ও বৈজ্ঞানিক গবেষণায়ও গুরুত্বপূর্ণ কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। তবে এ ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক মান অনুযায়ী সংগ্রহ, সংরক্ষণ, প্রক্রিয়াজাতকরণ এবং কঠোর নিয়ন্ত্রক কাঠামো অনুসরণ করা অপরিহার্য।
এ অবস্থায় সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি নীতিগত সহায়তা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং ওষুধ শিল্পের সমন্বিত উদ্যোগ নিশ্চিত করা গেলে পটুয়াখালীর এই স্নেক ভেনম ফার্ম দেশের বায়োমেডিকেল গবেষণা ও অ্যান্টিভেনম উৎপাদনে নতুন সম্ভাবনার ক্ষেত্র তৈরি করতে পারে।