
বাল্টিক সাগরে ফিনল্যান্ড ও এস্তোনিয়ার মধ্যে সংযোগকারী একটি সাবমেরিন টেলিযোগাযোগ কেবল ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার ঘটনায় রাশিয়া থেকে যাত্রা করা একটি কার্গো জাহাজ জব্দ করেছে ফিনল্যান্ড। পুলিশ এ ঘটনাকে ‘গুরুতর নাশকতা’ সন্দেহে তদন্ত করছে।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, বুধবার ফিনিশ পুলিশ ‘ফিটবার্গ’ (Fitburg) নামের একটি কার্গো জাহাজ জব্দ করে। জাহাজটি রাশিয়ার সেন্ট পিটার্সবার্গ বন্দর থেকে ইসরায়েলের উদ্দেশে যাত্রা করছিল। হেলসিঙ্কিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে ফিনল্যান্ডের বর্ডার গার্ড জানায়, জাহাজটি হেলসিঙ্কি ও এস্তোনিয়ার মধ্যে ফিনল্যান্ড উপসাগর দিয়ে যাওয়া একটি সাবমেরিন টেলিকম কেবল ক্ষতিগ্রস্ত করার সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে।
হেলসিঙ্কির পুলিশ প্রধান জারি লিউক্কু সাংবাদিকদের বলেন, “এই মুহূর্তে আমরা গুরুতর টেলিযোগাযোগ বিঘ্ন, গুরুতর নাশকতা এবং গুরুতর নাশকতার চেষ্টা—এই অভিযোগগুলো তদন্ত করছি।”
জাহাজটির ১৪ জন ক্রু সদস্য রাশিয়া, জর্জিয়া, কাজাখস্তান ও আজারবাইজানের নাগরিক। তদন্তকারীরা জানান, সবাইকে ফিনিশ পুলিশ হেফাজতে নিয়েছে। জাহাজটি সেন্ট ভিনসেন্ট অ্যান্ড দ্য গ্রেনাডিনসের পতাকা বহন করছিল।
ইউরোপে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাল্টিক সাগর অঞ্চলে বিদ্যুৎ কেবল, টেলিযোগাযোগ লিংক ও গ্যাস পাইপলাইনে একাধিক বিঘ্নের ঘটনার পর এ ঘটনা নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে। ইউক্রেনে যুদ্ধ শুরুর পর থেকে রাশিয়ার পক্ষ থেকে তথাকথিত ‘হাইব্রিড হুমকি’ বেড়েছে বলে ইউরোপীয় কর্মকর্তারা মনে করছেন—যা মস্কো অস্বীকার করে আসছে।
নেটোর শীর্ষ সামরিক কমান্ডার চলতি মাসের শুরুতে বলেন, এ ধরনের হুমকির মোকাবিলায় জোটকে প্রস্তুত থাকতে হবে। হাইব্রিড হুমকির মধ্যে সামরিক ও অসামরিক উভয় কৌশলই অন্তর্ভুক্ত, যেমন—সাইবার হামলা, ভুয়া তথ্য ছড়ানো, গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোয় নাশকতা এবং ড্রোন বা অনিয়মিত সশস্ত্র গোষ্ঠীর ব্যবহার।
পুলিশ ও বর্ডার গার্ড জানায়, ‘ফিটবার্গ’ জাহাজটি সমুদ্রে নোঙর টেনে চলছিল এবং পরে সেটিকে ফিনল্যান্ডের আঞ্চলিক জলসীমায় প্রবেশ করতে নির্দেশ দেওয়া হয়। ক্ষতিগ্রস্ত কেবলটি ফিনল্যান্ডের টেলিকম প্রতিষ্ঠান এলিসার মালিকানাধীন।
এলএসইজি তথ্য অনুযায়ী, জাহাজটির মালিক ফিটবার্গ শিপিং কোম্পানি লিমিটেড এবং ব্যবস্থাপক আলব্রস শিপিং অ্যান্ড ট্রেডিং লিমিটেড। রয়টার্স এসব প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যোগাযোগ করতে পারেনি।
এদিকে এস্তোনিয়ার বিচার মন্ত্রণালয় জানায়, বুধবার ফিনল্যান্ডের সঙ্গে সংযোগকারী আরেকটি টেলিকম কেবলও অচল হয়ে পড়ে। কেবলটি সুইডেনের প্রতিষ্ঠান আরেলিয়নের মালিকানাধীন বলে জানানো হয়েছে। আরেলিয়নের এক মুখপাত্রও বিভ্রাটের বিষয়টি নিশ্চিত করেন।
এস্তোনিয়ার প্রেসিডেন্ট আলার কারিস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্সে বলেন, তিনি এ ঘটনার বিষয়ে উদ্বিগ্ন, তবে “আশা করছি এটি ইচ্ছাকৃত কোনো কাজ নয়—তদন্তেই বিষয়টি পরিষ্কার হবে।”
ইউরোপীয় কমিশনের প্রযুক্তি কমিশনার হেন্না ভিরকুনেন জানান, কমিশন ঘটনাটি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে।
উল্লেখ্য, ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে ফিনল্যান্ড ‘ইগল এস’ নামের রাশিয়া-সংশ্লিষ্ট একটি তেলবাহী ট্যাংকারে অভিযান চালায়। তদন্তকারীদের মতে, জাহাজটি নোঙর টেনে বাল্টিক সাগরে একটি বিদ্যুৎ কেবল ও কয়েকটি টেলিকম সংযোগ ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল। তবে গত অক্টোবরে ফিনিশ আদালত ওই জাহাজের ক্যাপ্টেন ও ক্রুদের বিরুদ্ধে আনা মামলা খারিজ করে দেয়। আদালতের মতে, ইচ্ছাকৃত ক্ষতির প্রমাণ মেলেনি এবং সম্ভাব্য অবহেলার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট পতাকাবাহী রাষ্ট্র বা ক্রুদের নিজ নিজ দেশের মাধ্যমে নিষ্পত্তি করতে হবে।
নেটোর আটটি সদস্যরাষ্ট্র বাল্টিক সাগরের তীরবর্তী। ২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ শুরুর পর থেকে এ অঞ্চলে একাধিক অবকাঠামোগত বিঘ্নের ঘটনায় তারা উচ্চ সতর্কতায় রয়েছে। পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে নেটো সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বাল্টিক অঞ্চলে যুদ্ধজাহাজ, বিমান ও নৌ ড্রোন মোতায়েন বাড়িয়েছে।