
ঈদুল আজহার আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। এরই মধ্যে জমে উঠতে শুরু করেছে ভোলার স্থায়ী ও অস্থায়ী মিলিয়ে দেড় শতাধিক পশুর হাট। এর মধ্যে সবচেয়ে ব্যতিক্রমী ও ঐতিহ্যবাহী হিসেবে পরিচিত ভোলা সদর উপজেলার গজারিয়া পশুর হাট, যা স্থানীয়দের কাছে ‘মিয়া বাড়ির দরজার হাট’ নামে পরিচিত। প্রায় আড়াই শ’ বছরের পুরোনো এই ঐতিহ্যবাহী হাটে সপ্তাহে তিনদিন পশুর হাট বসে এবং প্রতিটি হাটে কয়েক কোটি টাকার গরু, মহিষ ও ছাগল কেনাবেচা হয়।
গজারিয়া পশুর হাটের সবচেয়ে বড় বিশেষত্ব হলো এখানে ক্রেতা কিংবা বিক্রেতাদের কাছ থেকে কোনো ধরনের টোল, খাজনা বা চাঁদা নেওয়া হয় না। ফলে দূর-দূরান্ত থেকে আসা মানুষ নির্বিঘ্নে ও স্বাচ্ছন্দ্যে পশু কেনাবেচা করতে পারেন। খোলা পরিবেশ, দীর্ঘদিনের ঐতিহ্য, নিরাপদ বেচাকেনা এবং অতিরিক্ত খরচ না থাকায় এই হাট ভোলাসহ আশপাশের জেলার মানুষের কাছে ব্যাপক জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে।
ঈদকে সামনে রেখে ভোলা সদর উপজেলার উত্তর দিঘলদী ইউনিয়নের ৭ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত গজারিয়া বাজার সংলগ্ন বালিয়া মিঞা বাড়ির সামনের খোলা মাঠে বসে এ পশুর হাট। দালাল ও খাজনামুক্ত হওয়ায় জেলার চরফ্যাশন, তজুমদ্দিন, লালমোহন, দৌলতখান, চরপাতা ও ভোলা সদরের বিভিন্ন এলাকা থেকে নানা প্রজাতির কোরবানির দেশি গরু ও ছাগল এখানে বিক্রি হয়।
হাটে গরু নিয়ে আসা বিক্রেতা লোকমান হোসেন বলেন, “গজারিয়া বাজার ভোলার ঐতিহ্যবাহী কোরবানির পশুর হাট। মরহুম নাজিউর রহমান মঞ্জুর পূর্বপুরুষরা এই হাট খাজনা ফ্রি করে দিয়ে গেছেন তাই আমরা এই হাটে গরু নিয়ে আসি। কোনো দালাল নাই, বিক্রি করে পরিপূর্ণ অর্থটাই পাই।”
খামারি মাহফুজ জানান, “আমরা অন্য হাটে একটা গরু বিক্রি করলে লাখে ৫ হাজার টাকার মতো খাজনা দেয়া লাগে। এখানে সম্পূর্ণ খাজনা ফ্রি। তাই ক্রেতা-বিক্রেতা উভয় কেনা-বেচা করে খুশি।”
হাটের ইতিহাস সম্পর্কে মরহুম নাজিউর রহমান মঞ্জুর চাচাতো ভাই জামাল মিয়া বলেন, “প্রায় আড়াই শ’ বছর আগে তাদের পূর্বপুরুষ আরব আলী মিঞা কোরবানির পশু কিনতে দক্ষিণ দিঘলদী ইউনিয়নের বাংলাবাজার খাষেরহাট নামক পশুর হাটে যান। খাজনা আদায়কারী তার কাছে খাজনার টাকা দাবি করায় বিষয়টি তার আত্মসম্মানে আঘাত করে। খাজনার বিড়ম্বনার শিকার হয়ে তাদের মিঞা বাড়ির সামনের বিশাল মাঠে খাজনামুক্ত পশুর হাট বসান। সেই থেকেই সম্পূর্ণ খাজনামুক্ত জেলার অন্যতম কোরবানির পশুর হাট হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।”
বাংলাদেশে ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে দেশজুড়ে শত শত পশুর হাট বসে। তবে অধিকাংশ হাটে টোল, চাঁদা ও দালালি ব্যবস্থার কারণে ক্রেতা-বিক্রেতাদের অতিরিক্ত খরচ বহন করতে হয়। গজারিয়ার মতো খাজনামুক্ত হাটগুলো এই প্রথা ভেঙে স্বচ্ছ ও ন্যায্য মূল্যে পশু কেনাবেচার একটি আদর্শ মডেল উপস্থাপন করে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, ঐতিহ্যবাহী হাটগুলোর সংরক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন ও ডিজিটাল লেনদেন ব্যবস্থার মাধ্যমে পশুর হাটগুলোকে আরও নিরাপদ ও স্বচ্ছ করা সম্ভব।