
ঠিকাদার বদল হলেও বদলায়নি কাজের মান ও উপকরণে ব্যাপক ফাঁকিবাজির অভিযোগ, ভুক্তভোগী পরিবারকে প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ জসিনুর রহমান , নীলফামারী প্রতিনিধি : নীলফামারীর জলঢাকা পৌরসভা এলাকার মাথাভাঙ্গা ২নং ওয়ার্ডে একটি সড়কের আরসিসি (R.C.C) ঢালাই কাজে চরম অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রতিবাদ করায় শফিকুল ইসলাম সোহাগ নামের এক স্থানীয় সচেতন যুবকের ওপর অতর্কিত হামলার ঘটনা ঘটেছে।
এই নৃশংস হামলার প্রতিবাদে এবং দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে গতকাল (বুধবার দুপুরে) স্থানীয় এলাকাবাসীর উদ্যোগে এক মানববন্ধন কর্মসূচি অনুষ্ঠিত হয়েছে।
মানববন্ধনে বক্তব্য রাখেন, হামলায় গুরুতর আহত শফিকুল ইসলাম সোহাগ, তার পিতা সোলাইমান আলী এবং স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুল হাই। বক্তারা ঘটনার তীব্র নিন্দা জানিয়ে বিস্তারিত বিবরণ তুলে ধরে বলেন, গত মঙ্গলবার দুপুর আনুমানিক ২:০০ ঘটিকার সময় জলঢাকা বাজার থেকে নিজ বাড়ীতে ফেরার পথে শাহীন ডাক্তারের বাড়ি হতে হাই এর মিল পর্যন্ত চলমান রাস্তার (আরসিসি) ঢালাই কাজ দেখতে পান সোহাগ। এ সময় একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে তিনি কাজটিতে চলমান চরম অনিয়মের চিত্র হাতেনাতে প্রত্যক্ষ করেন।
প্রাপ্ত তথ্য ও নথিসূত্রে জানা গেছে, উক্ত সড়কটির আরসিসি ঢালাই কাজের দৈর্ঘ্য ১০০ মিটার এবং প্রস্থ ৩ মিটার। সিডিউল অনুযায়ী এতে ১০ মিলিমিটার (10mm) রড, ৩৮ মিলিমিটার (38mm) সাইজের পাথর, বেইজ বা এএসের জন্য ০.৫ এফ.এম (FM) এবং ঢালাইয়ের কাস্টিংয়ের জন্য ২.৫ এফ.এম (FM) মানের বালু ব্যবহার করার কথা। এই কাজের মূল তালিকাভুক্ত ঠিকাদার হলেন এনামুল হক লেবু এবং কাজটির সমাপ্তির মেয়াদ আগামী ৩১/০৭/২০২৬ইং তারিখ পর্যন্ত নির্ধারিত রয়েছে।
তবে মাঠপর্যায়ে কাজের ক্ষেত্রে এই এস্টিমেটের কোনো তোয়াক্কাই করা হচ্ছিল না বলে অভিযোগ উঠেছে। ঢালাইয়ের সময় রডের জালি অতিরিক্ত ফাঁকা করে বিছানো হচ্ছিল। ভাল মানের লাল বালু ২.৫ এফএম (F.M)এর পরিবর্তে নিম্নমানের সাধারণ ভিটি বালু এবং শিডিউল (রেশিও)অনুযায়ী যেখানে ৫ ব্যাগ সিমেন্ট দেওয়ার কথা, সেখানে মাত্র ৩ ব্যাগ সাধারণ সিমেন্ট দিয়ে ঢালাই চালানো হচ্ছিল। এছাড়া সিডিউলভুক্ত ভুটানের এলসি পাথরের পরিবর্তে অত্যন্ত নিম্নমানের মরা পাথর ব্যবহার করে ঢালাইয়ের কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করা হচ্ছিল।
মানববন্ধনে আহত যুবকের পিতা সোলাইমান আলী বলেন, সোহাগ এই প্রকাশ্য ও চরম অনিয়মের তীব্র প্রতিবাদ জানালে সেখানে এক অনাকাঙ্ক্ষিত ও বর্বর পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়। জানা গেছে, উক্ত কাজের মূল ঠিকাদার আওয়ামী লীগ সমর্থিত এনামুল হক লেবু মিয়াকে সম্প্রতি হেনস্তা করে কাজটি জোরপূর্বক ছিনিয়ে নেন স্থানীয় বিএনপি নেতা ময়নুল ইসলাম ও তার সহযোগীরা। এরপর তারা নতুন করে কাজ শুরু করলে এই অনিয়মের চিত্র সামনে আসে। এ বিষয়ে প্রতিবাদ করার অপরাধে ময়নুল ইসলাম ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা দলবদ্ধ হয়ে পূর্বপরিকল্পিতভাবে শফিকুল ইসলাম সোহাগের ওপর আকস্মিক ও অতর্কিত হামলা চালায়।
হামলাকারীরা সোহাগকে লোহার রড ও লাঠিসোটা দিয়ে নির্মমভাবে মারধর ও শারীরিক নির্যাতন করে গুরুতর জখম করে। বর্তমানে তিনি আশঙ্কাজনক অবস্থায় স্থানীয় হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। তিনি বলেছেন, অত্যন্ত দুঃখের বিষয়, এই বর্বরোচিত হামলার পরও ক্ষান্ত হয়নি হামলাকারীরা। বর্তমানে ভুক্তভোগী সোহাগ ও তার পরিবারকে মামলা না করার জন্য এবং গণমাধ্যমের মুখ বন্ধ রাখতে নানাভাবে সরাসরি প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে মানববন্ধনে জানানো হয়। ফলে বর্তমানে পুরো পরিবারটি স্বাধীনভাবে চলাফেরা এবং জানমালের নিরাপত্তা নিয়ে চরম শঙ্কার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
মানববন্ধনে সমবেত বক্তারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “একটি রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন কাজের প্রকাশ্য অনিয়মের প্রতিবাদ করা যদি অপরাধ হয়, তবে সাধারণ মানুষের বাকস্বাধীনতা ও গণতান্ত্রিক অধিকার কোথায় থাকবে? আমরা এই ন্যাক্কারজনক ঘটনার সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত দাবি করছি।” একই সাথে তারা দুর্নীতিবাজ চক্র ও হামলাকারীদের অবিলম্বে গ্রেফতার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার পাশাপাশি ভুক্তভোগী অসহায় পরিবারটির জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের জরুরি ও আশু হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।