
কুয়াকাটা সমুদ্র সৈকতের পূর্ব পাশে ডিসি বাংলা সংলগ্ন এলাকায় জোয়ারের পানির সঙ্গে ভেসে এসেছে প্রায় ১০ ফুট লম্বা একটি মৃত ইরাবতী প্রজাতির ডলফিন। সোমবার (২৫ মে) দুপুর ২টার দিকে স্থানীয় বাসিন্দারা ডলফিনটি দেখতে পেয়ে ডলফিন রক্ষা কমিটি ও উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের সদস্যদের খবর দেন। উদ্ধারকালে ডলফিনটির শরীরের অধিকাংশ চামড়া উঠে গেছে, শরীর ক্ষতবিক্ষত এবং লেজে দড়ি বাঁধা ছিল।
উপকূল পরিবেশ রক্ষা আন্দোলনের যুগ্ম আহ্বায়ক আবুল হোসেন রাজু জানান, খবর পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই স্বেচ্ছাসেবকদের নিয়ে ঘটনাস্থলে গিয়ে ডলফিনটি উদ্ধার করা হয়। তিনি বলেন, “জীবিত কিংবা মৃত ডলফিন, কচ্ছপ, রাজ কাঁকড়া বা অন্যান্য সামুদ্রিক প্রাণী উদ্ধারের সময় প্রায়ই তাদের মুখ বা লেজে জালের টুকরো কিংবা দড়ি বাঁধা অবস্থায় দেখা যায়, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক।”
পরবর্তীতে ডলফিন রক্ষা কমিটি, স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবক, বন বিভাগ ও কুয়াকাটা পৌরসভার সদস্যরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে মরদেহটি উদ্ধার করেন। জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশগত ঝুঁকি বিবেচনায় পরে ডলফিনটিকে নির্ধারিত স্থানে মাটিচাপা দেওয়া হয়।
বাংলাদেশ জীববৈচিত্র্য সংরক্ষণ ফেডারেশন (বিবিসিএফ)-এর সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক কেএম বাচ্চু জানান, উদ্ধার হওয়া ডলফিনটি একটি পুরুষ ইরাবতী ডলফিন, যা বিশ্বব্যাপী বিপন্ন প্রজাতির তালিকাভুক্ত। তিনি বলেন, “বর্ষা মৌসুম শুরু হলে বঙ্গোপসাগর উপকূলের কুয়াকাটা এলাকায় মাঝেমধ্যে মৃত সামুদ্রিক প্রাণী ভেসে আসার ঘটনা ঘটে। গত কয়েক বছরে শুশুক, ইরাবতী ডলফিন, বোতল-নাক ডলফিন ও স্পিনার ডলফিনসহ বিভিন্ন প্রজাতির সামুদ্রিক প্রাণীর মরদেহ পাওয়া গেছে।”
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৩ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত কুয়াকাটা উপকূলে অন্তত ৫০টি বিভিন্ন প্রজাতির মৃত ডলফিন এবং শতাধিক কচ্ছপ ও রাজ কাঁকড়া ভেসে এসেছে। ডলফিন রক্ষা কমিটির সংরক্ষিত তথ্য অনুযায়ী ২০২৩ সালে ১৫টি, ২০২৪ সালে ১০টি, ২০২৫ সালে ১৭টি এবং ২০২৬ সালে এখন পর্যন্ত ৯টি মৃত ডলফিন উদ্ধার করা হয়েছে।
ডলফিন রক্ষা কমিটির টিম লিডার রুমান ইমতিয়াজ তুষার বলেন, “উপকূলীয় এলাকায় একের পর এক সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যু আমাদের জন্য বড় সতর্কবার্তা। কচ্ছপ ও ডলফিন সামুদ্রিক বাস্তুতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এদের সংখ্যা কমে গেলে পুরো খাদ্যচক্রের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে। তাই দ্রুত সমন্বিত গবেষণা, নজরদারি ও সচেতনতা কার্যক্রম জোরদার করা জরুরি।”
পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মৎস্য বিজ্ঞান অনুষদের অধ্যাপক ড. রাজিব সরকার বলেন, “ট্রলার ও জেলেদের জালে আটকা পড়ে দীর্ঘ সময় পানির নিচে থাকার কারণে অনেক সময় ডলফিন ও কচ্ছপ শ্বাসরুদ্ধ হয়ে মারা যায়। এছাড়া নৌযানের আঘাত, শিল্পবর্জ্য, তেল ও রাসায়নিক দূষণও সামুদ্রিক প্রাণীর মৃত্যুর অন্যতম কারণ।”
বন বিভাগের মহিপুর রেঞ্জ কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান জানান, উপকূলীয় এলাকায় মাঝেমধ্যে এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকে। মৃত ডলফিন বা কচ্ছপের খবর পেলে বন বিভাগ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করে।
বাংলাদেশের উপকূলীয় অঞ্চলে ইরাবতী ডলফিন একটি বিপন্ন প্রজাতি যা আইইউসিএন লাল তালিকায় অন্তর্ভুক্ত। বঙ্গোপসাগরে জেলেদের জালে আটকা পড়া, নৌ-দূষণ, প্লাস্টিক বর্জ্য ও জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে সামুদ্রিক প্রাণীদের মৃত্যু উদ্বেগজনক হারে বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, টার্টল এক্সক্লুডার ডিভাইস (TED) ব্যবহার, জেলেদের সচেতনতা বৃদ্ধি, সামুদ্রিক সংরক্ষণ এলাকা ঘোষণা ও নিয়মিত নজরদারির মাধ্যমে এসব প্রাণী রক্ষা করা সম্ভব।