
টানা বৃষ্টি ও কালবৈশাখী ঝড়ের তাণ্ডবে ভোলার বিস্তীর্ণ কৃষিজমি পানির নিচে তলিয়ে গিয়ে ব্যাপক ফসলহানির ঘটনা ঘটেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে মুগডাল, চিনাবাদাম ও সয়াবিনের আবাদ। কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাব অনুযায়ী, গত কয়েক দিনের দুর্যোগে জেলায় প্রায় ২১ কোটি টাকার ফসলের ক্ষতি হয়েছে। আকস্মিক এই ক্ষতিতে জেলার শত শত কৃষক এখন চরম দুশ্চিন্তা ও অনিশ্চয়তার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, বর্তমানে জেলার অধিকাংশ এলাকায় মুগ, চিনাবাদাম ও সয়াবিন ঘরে তোলার মৌসুম চলছিল। ঠিক এমন সময় টানা বৃষ্টি ও দমকা হাওয়ায় ফসলি জমিতে পানি জমে যায়। অনেক জমিতে কয়েকদিন ধরে পানি আটকে থাকায় ক্ষেতের ফসল পচে নষ্ট হতে শুরু করেছে। বিশেষ করে নিচু ও জলাবদ্ধ এলাকায় ক্ষতির মাত্রা বেশি।
ভোলা সদর উপজেলার চরসাসাইয়া ইউনিয়নের কৃষক রুহুল আমিন বলেন, “৬০ শতাংশ জমিতে সয়াবিন ও ১২ শতাংশ জমিতে মুগডালের আবাদ করেছিলাম। কয়েকদিনের বৃষ্টিতে পুরো জমি পানির নিচে চলে গেছে। এখন ফসল তোলার আর কোনো সুযোগ নেই। প্রায় ৩০ হাজার টাকার ক্ষতি হয়েছে।”
একই উপজেলার আলীনগর এলাকার কৃষক পারভেজ জানান, লাভের আশায় ধারদেনা ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে তিনি আবাদ করেছিলেন। কিন্তু এখন পুরো ক্ষেত পানিতে তলিয়ে গেছে। তিনি বলেন, “মাঠে যা ছিল সবই শেষ। সব মিলিয়ে প্রায় তিন লাখ টাকার ক্ষতি হয়েছে। এখন কিভাবে ঋণ পরিশোধ করব, সেই চিন্তায় আছি।”
ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অভিযোগ, অনেক এলাকায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকায় জমিতে দীর্ঘ সময় পানি আটকে রয়েছে। খাল ও জলাশয় ভরাট হয়ে যাওয়ায় পানি দ্রুত নামতে পারছে না। এতে ক্ষতির পরিমাণ আরও বেড়েছে।
বাপ্তা এলাকার কৃষক মো. মাসুদ বলেন, “এক সপ্তাহের টানা বৃষ্টিতে জমি ডুবে গেছে। যদি পানি নামার ব্যবস্থা থাকত তাহলে এত ক্ষতি হতো না।”
আলীনগর এলাকার কৃষক রিপন বলেন, “জমির সঙ্গে খালের সংযোগ থাকলে পানি দ্রুত নেমে যেত। কিন্তু পানি নিষ্কাশনের কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেই। কৃষকদের কথা শুধু বলা হয়, বাস্তবে তেমন সহযোগিতা পাওয়া যায় না।”
স্থানীয় কৃষকদের ভাষ্য, চলতি মৌসুমে আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ভালো ফলনের আশা করেছিলেন তারা। কিন্তু মৌসুমের শেষ সময়ে এসে প্রাকৃতিক দুর্যোগে সেই স্বপ্ন ভেঙে গেছে। অনেক কৃষকই এখন নতুন করে আবাদ চালিয়ে যাওয়ার সক্ষমতা হারানোর আশঙ্কা করছেন।
এদিকে কৃষি বিভাগ জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে মাঠপর্যায়ে কাজ চলছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের তালিকা প্রস্তুত করে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হবে। পাশাপাশি কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ ও সহায়তা দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ভোলার উপপরিচালক (চলতি দায়িত্ব) ড. শামীম আহমেদ বলেন, “গত ২৮ এপ্রিল থেকে ৩ মে পর্যন্ত টানা বৃষ্টি ও প্রাকৃতিক দুর্যোগে জেলায় ব্যাপক ফসলের ক্ষতি হয়েছে। প্রাথমিক হিসাবে এক কোটি ৬২ লাখ টাকার মুগডাল, ১৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকার চিনাবাদাম এবং দুই কোটি ৭৮ লাখ টাকার সয়াবিন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।”
তিনি আরও বলেন, কৃষকদের ক্ষয়ক্ষতির বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের সহায়তার বিষয়ে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।