
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘বোর্ড অফ পিস’ হামাসের কাছে একটি ৮ মাস মেয়াদী নিরস্ত্রীকরণ পরিকল্পনা পেশ করেছে, যেখানে গাজায় হামাসের বিশাল টানেল নেটওয়ার্ক ধ্বংস ও পর্যায়ক্রমে অস্ত্র জমা দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। তবে হামাস প্রকাশ্যে নিরস্ত্রীকরণের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করলেও পরিকল্পনাটি অধ্যয়ন করছে বলে জানিয়েছে।
ট্রাম্পের ‘বোর্ড অফ পিস’ গত সপ্তাহে হামাসের কাছে একটি ১২-দফা নথি ও পাঁচ-পর্যায়ের সময়রেখা সম্বলিত প্রস্তাব পেশ করে, যা প্রথমবারের মতো আল জাজিরা প্রতিবেদনে প্রকাশিত হয় এবং পরে রয়টার্সের কাছে দুজন ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা নিশ্চিত করেন। পরিকল্পনা অনুযায়ী, গাজার নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ ফিলিস্তিনি প্রযুক্তিবিদদের নিয়ে গঠিত ‘ন্যাশনাল কমিটি ফর দ্য অ্যাডমিনিস্ট্রেশন অফ গাজা’ (এনসিএজি)-এর হাতে ন্যস্ত হবে এবং “গাজা অস্ত্রমুক্ত” যাচাইয়ের পর ইসরায়েলি বাহিনী সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করবে।
পরিকল্পনার সময়রেখা অনুসারে, প্রথম ১৫ দিনে এনসিএজি গাজার প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করবে। ১৬-৪০ দিনের মধ্যে ইসরায়েল তার নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে ভারী অস্ত্র সরিয়ে নেবে এবং আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা বাহিনী মোতায়েন করা হবে। ৩১-৯০ দিনের তৃতীয় পর্যায়ে হামাস তার সব ভারী অস্ত্র ও সামরিক সরঞ্জাম এনসিএজির কাছে হস্তান্তর করবে এবং “সব টানেল, বিস্ফোরক ও সামরিক অবকাঠামো ধ্বংসের অনুমতি দেবে”। ৯১-২৫০ দিনের চতুর্থ পর্যায়ে এনসিএজির পুলিশ বাহিনী অবশিষ্ট সব অস্ত্র সংগ্রহ ও নিবন্ধন করবে, এবং ইসরায়েলি বাহিনী পর্যায়ক্রমে প্রত্যাহার শুরু করবে। পঞ্চম ও চূড়ান্ত পর্যায়ে নিরস্ত্রীকরণ যাচাই শেষে ইসরায়েলি বাহিনী সম্পূর্ণ প্রত্যাহার করবে এবং পুনর্গঠন কাজ শুরু হবে।
নিরস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়া যাচাইয়ের জন্য বোর্ড অফ পিসের প্রধান দূত নিকোলে ম্লাদেনভের নেতৃত্বে ‘উইপন্স কালেকশন ভেরিফিকেশন কমিটি’ গঠন করা হবে । নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে, “গাজা ‘এক কর্তৃপক্ষ, এক আইন, এক অস্ত্র’ নীতির অধীনে পরিচালিত হবে, যেখানে শুধুমাত্র এনসিএজি কর্তৃক অনুমোদিত ব্যক্তিরাই অস্ত্র ধারণ করতে পারবেন এবং সব সশস্ত্র গোষ্ঠী সামরিক কার্যক্রম বন্ধ করবে”। পুনর্গঠন কাজ শুধুমাত্র নিরস্ত্রীকৃত এলাকায় অনুমোদিত হবে।
একজন ফিলিস্তিনি কর্মকর্তা, যিনি আলোচনার সংবেদনশীলতার কারণে নাম প্রকাশ না করার অনুরোধ করেছেন, বলেছেন পরিকল্পনাটি “অন্যায়” এবং হামাস কিছু “সংশোধনী ও উন্নতি” চাইতে পারে। তিনি উল্লেখ করেন, পরিকল্পনায় ইসরায়েল তার দায়িত্ব পালন করবে—এমন কোনো গ্যারান্টি নেই। পুনর্গঠন ও জীবনযাত্রার উন্নতিকে নিরস্ত্রীকরণের মতো রাজনৈতিক ইস্যুর সাথে যুক্ত করায় যুদ্ধ পুনরায় শুরু হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে।
হামাস প্রকাশ্যে অস্ত্র ত্যাগের আহ্বান দীর্ঘদিন ধরে প্রত্যাখ্যান করে আসছে, যা গাজার মাটির নিচের টানেল নেটওয়ার্কে পরিবহন ও সংরক্ষণ করা হয়েছে বলে ইসরায়েল দাবি করে। ইসরায়েল স্পষ্ট করেছে, হামাস সম্পূর্ণ নিরস্ত্র না হওয়া পর্যন্ত গাজা থেকে প্রত্যাহারে রাজি হবে না। বৃহস্পতিবার ইসলামিক জিহাদসহ তিনটি ফিলিস্তিনি ফ্যাকশন বিবৃতি দিয়ে পরিকল্পনার সমালোচনা করে, যেখানে পুনর্গঠন ও ইসরায়েলি প্রত্যাহারের চেয়ে নিরস্ত্রীকরণকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়।
অক্টোবরের যুদ্ধবিরতি চুক্তির পর ইসরায়েল গাজার অর্ধেকের বেশি এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে, অন্যদিকে হামাস অবশিষ্ট অংশ ও সেখানকার দুই মিলিয়ন মানুষের ওপর নিয়ন্ত্রণ বজায় রেখেছে, যাদের অধিকাংশই দুই বছরের ধারাবাহিক ইসরায়েলি বোমাবর্ষণে গৃহহীন। হামাস কর্মকর্তারা ব্যক্তিগত পর্যায়ে নিরস্ত্রীকরণে উন্মুক্ততার ইঙ্গিত দিলেও শর্ত দিয়েছেন যে এটি একটি রাজনৈতিক প্রক্রিয়ার অংশ হতে হবে, যেখানে ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার প্রতিশ্রুতি থাকবে। তবে ১২-দফা পরিকল্পনায় ফিলিস্তিন রাষ্ট্র বা স্বাধীনতার কোনো উল্লেখ নেই।
হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ডিলান জনসন বলেছেন, “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র সব পক্ষ ও মধ্যস্থতাকারীদের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে পরিকল্পনা পূর্ণ বাস্তবায়ন ও দীর্ঘমেয়াদী স্থিতিশীলতার জন্য একটি টেকসই নিরাপত্তা কাঠামো এগিয়ে নিতে”। ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু আগেই সতর্ক করেছিলেন, হামাসকে “সহজ উপায়ে বা কঠিন উপায়ে নিরস্ত্র করা হবে, কিন্তু তা ঘটবেই”।ট্রাম্পের বোর্ড অফ পিসের প্রস্তাবিত ৮ মাস মেয়াদী নিরস্ত্রীকরণ পরিকল্পনা গাজা সংকটের সমাধানে একটি সম্ভাব্য রূপরেখা হলেও হামাসের প্রকাশ্য অবস্থান ও ফিলিস্তিনি পক্ষের সংশোধনের দাবি বাস্তবায়নে চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি করছে। নিরস্ত্রীকরণ, পুনর্গঠন ও ইসরায়েলি প্রত্যাহারের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা এবং ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের ইস্যু অন্তর্ভুক্তি ছাড়া কোনো দীর্ঘমেয়াদী সমাধান কার্যকর হওয়া কঠিন বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।