
নিজের ভয় জয় করে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার গল্প; ধারাভাষ্যের মাইক্রোফোনই খুলে দিয়েছে বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক জীবনের দুয়ার
একসময় খেলার মাঠে হাজারো দর্শকের কোলাহলের মধ্যে হাতে তুলে নিয়েছিলেন একটি মাইক্রোফোন। উদ্দেশ্য ছিল খেলার প্রতিটি মুহূর্ত, উত্তেজনা আর রোমাঞ্চকে শব্দের মাধ্যমে দর্শক-শ্রোতার কাছে পৌঁছে দেওয়া। সেই মাইক্রোফোনই ধীরে ধীরে হয়ে উঠেছে তাঁর আত্মবিশ্বাসের সঙ্গী, স্বপ্নপূরণের হাতিয়ার। মাঠের ধারাভাষ্য থেকে শুরু হওয়া পথচলা তাঁকে নিয়ে গেছে গানের মঞ্চে, আবৃত্তির আসরে, অভিনয় ও অনুষ্ঠান উপস্থাপনার জগতে। দেখতে দেখতে পেরিয়ে গেছে ২৫টি বছর।
তিনি তালহা তালুকদার বাঁধন। ভোলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের পরিচিত এক মুখ। তাঁর কাছে ধারাভাষ্য কেবল খেলার বর্ণনা দেওয়ার কাজ নয়, বরং নিজেকে আবিষ্কার করা, জড়তা কাটিয়ে ওঠা এবং জীবনের নানা ক্ষেত্রে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠার এক দীর্ঘ শিক্ষাযাত্রা।
২০০১ সাল। ভোলা সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় মাঠে জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল একটি টেপ টেনিস ক্রিকেট লীগ। আয়োজনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন বর্তমানে ভোলা জেলা ক্রীড়া সংস্থার সদস্যসচিব মুনতাসির আলম চৌধুরী রবিন। সেই প্রতিযোগিতায় একতা সংঘের হয়ে খেলতে নেমেছিলেন বাঁধন। কিন্তু কে জানত, সেদিনের সেই ক্রিকেট আসরই তাঁর জীবনের গতিপথ বদলে দেবে! খেলার মাঠে খেলোয়াড় হিসেবে অংশ নিতে গিয়ে একসময় হাতে তুলে নেন মাইক্রোফোন। শুরু হয় ধারাভাষ্যের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ পথচলা।
এরপর আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। জেলা ক্রীড়া সংস্থার সাবেক সাধারণ সম্পাদক ইয়ারুল আলম লিটন তাঁর প্রতিভা ও আগ্রহের প্রতি আস্থা রেখে জেলা ক্রীড়া সংস্থার ছোট-বড় বিভিন্ন আয়োজনের ধারাভাষ্যের দায়িত্ব দেন। বাঁধনের ভাষায়, এই মানুষটির হাত ধরেই তাঁর পথচলা সহজ ও বিস্তৃত হয়েছে। শুধু ভোলায় নয়, দেশের বিভিন্ন জেলায় ধারাভাষ্য দেওয়ার স্বপ্ন দেখতেন লিটন। সেই স্বপ্ন বাস্তবেও রূপ নেয়।
জাতীয় পর্যায়ের বিভিন্ন ক্রীড়া আয়োজনেও যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয় তাঁর। জাতীয় ভলিবল ফেডারেশনের পরিচালনা কমিটির উদ্যোগে বিভিন্ন জাতীয় ইভেন্টে ধারাভাষ্য দেওয়ার অভিজ্ঞতা অর্জন করেন তিনি। নাটোরে প্রয়াত কিংবদন্তি ধারাভাষ্যকার খোদাবক্স মৃধার পাশে বসে মাইক্রোফোন হাতে নেওয়ার স্মৃতিও তাঁর জীবনের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অর্জন। বাঁধনের মতে, এ সুযোগ তৈরির পেছনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল ইয়ারুল আলম লিটনের।
খেলার মাঠের বাইরেও তাঁর কণ্ঠ ছড়িয়ে পড়ে রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক বিভিন্ন আয়োজনে। জাতীয় দিবসগুলোতে মাঠে অনুষ্ঠিত কুচকাওয়াজ ও শিশু সমাবেশে ধারাভাষ্য দেওয়ার সুযোগ করে দেন জেলা ক্রীড়া সংস্থার সেই সময়ের সাধারণ সম্পাদক। জেলা প্রশাসনের মাধ্যমে পাওয়া এই দায়িত্ব তাঁর অভিজ্ঞতার ঝুলিকে আরও সমৃদ্ধ করে।
দীর্ঘ ২৫ বছরের পথচলায় মাঠের উত্তেজনা বর্ণনা করার পাশাপাশি দেশের বহু পরিচিত ক্রীড়াবিদ, রাজনীতিক ও বিশিষ্ট ব্যক্তিত্বের সাক্ষাৎকার নেওয়ার অভিজ্ঞতা হয়েছে তাঁর। জাতীয় শেরেবাংলা কাপের আঞ্চলিক পর্যায়ের খেলায় ভোলা ও ঝালকাঠির মধ্যকার ম্যাচ শেষে জাতীয় ফুটবল দলের সাবেক অধিনায়ক এবং বর্তমান যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হকের সাক্ষাৎকার নেওয়া ছিল তেমনই একটি স্মরণীয় অভিজ্ঞতা।
ঘূর্ণিঝড় সিডর-পরবর্তী সময়ে ভোলার স্টেডিয়ামে বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলের একটি প্রীতি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়। সেই আয়োজনে আরিফ খান জয়, আলফাজ হোসেন, আমিনুল হক ও মাসুদ রানাসহ জাতীয় দলের একাধিক পরিচিত খেলোয়াড়ের সাক্ষাৎকার নেন বাঁধন। হাজারো দর্শকের সামনে দাঁড়িয়ে মাইক্রোফোনে তাঁদের কথা তুলে ধরার অভিজ্ঞতা তাঁর আত্মবিশ্বাসকে আরও দৃঢ় করে।
নারী ক্রিকেটের বিকাশের শুরুর দিকের স্মৃতিও রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। প্রথম জাতীয় মহিলা ক্রিকেট লিগে চ্যাম্পিয়ন হয়েছিল ভোলা জেলা দল। দেশের বিভিন্ন প্রান্তের নারী ক্রিকেটারদের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত সেই প্রতিযোগিতায় সালমা ইসলাম পান্নাসহ নারী ক্রিকেটের পরিচিত খেলোয়াড়দের সাক্ষাৎকার নেওয়ার পাশাপাশি ম্যাচের ধারাভাষ্য দিয়েছেন তিনি। এ ছাড়া মাঠের পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠানে মন্ত্রী, প্রতিমন্ত্রী, সংসদ সদস্য ও সচিবসহ রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের বক্তব্য উপস্থাপনের অভিজ্ঞতাও রয়েছে তাঁর।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ানোর সেই অভিজ্ঞতা তাঁকে নিয়ে গেছে আরও বিস্তৃত সাংস্কৃতিক পরিসরে। এখন তিনি নিয়মিত গান পরিবেশন করেন, আবৃত্তি করেন, বিভিন্ন অনুষ্ঠানে উপস্থাপনা করেন এবং মঞ্চনাটকে অভিনয়ও করেন। একেকটি ক্ষেত্র আলাদা হলেও তাঁর কাছে সবকিছুর মূল শক্তি সেই পুরোনো অভিজ্ঞতা—খেলার মাঠে দাঁড়িয়ে হাজারো মানুষের সামনে কথা বলার সাহস।
বিশেষ করে গানের মঞ্চে যখন অসংখ্য শ্রোতার সামনে দাঁড়িয়ে কণ্ঠ মেলান, তখনও যেন ফিরে আসে সেই প্রথম দিনের স্মৃতি। খেলার মাঠের মাইক্রোফোন তাঁকে শিখিয়েছে কীভাবে দর্শকের সামনে নিজেকে মেলে ধরতে হয়, কীভাবে মুহূর্তের মধ্যে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে হয় এবং কীভাবে নিজের কণ্ঠের ওপর আস্থা রাখতে হয়।
বাঁধনের কথায়, “খেলার মাঠই আমাকে মঞ্চ চিনিয়েছে, আর মাইক্রোফোন চিনিয়েছে নিজের কণ্ঠের শক্তি।”
এই ২৫ বছরের পথচলাকে তিনি শুধু সাফল্যের হিসাব দিয়ে বিচার করেন না। বরং এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে অসংখ্য মানুষের ভালোবাসা, অনুপ্রেরণা, স্মৃতি ও কৃতজ্ঞতা। যাঁরা তাঁর ওপর আস্থা রেখেছেন, সুযোগ দিয়েছেন এবং প্রতিটি পর্যায়ে উৎসাহ জুগিয়েছেন, তাঁদের অবদানকে বিশেষভাবে স্মরণ করেন তিনি।
ভোলা শহরের সার্কুলার রোড এলাকার বাসিন্দা তালহা তালুকদার বাঁধন মনে করেন, একজন মানুষের জীবনে বড় পরিবর্তন আনতে কখনো কখনো ছোট একটি সুযোগই যথেষ্ট। একটি মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ানোর সাহস থেকেই যে নিজের ভয় জয় করে জীবনের নানা অঙ্গনে আত্মবিশ্বাসী হয়ে ওঠা সম্ভব, তাঁর নিজের জীবনই যেন তার উদাহরণ।
২৫ বছর পেরিয়ে আজও মাইক্রোফোনের প্রতি তাঁর ভালোবাসা প্রথম দিনের মতোই অমলিন। খেলার মাঠের সেই কিশোরসুলভ আগ্রহ এখন পরিণত হয়েছে বহুমাত্রিক সাংস্কৃতিক চর্চায়। সময়ের সঙ্গে বদলেছে মঞ্চ, বদলেছে আয়োজন, বেড়েছে অভিজ্ঞতা; কিন্তু বদলায়নি কণ্ঠের প্রতি ভালোবাসা।
তালহা তালুকদার বাঁধনের কাছে তাই ধারাভাষ্য এখন আর কেবল খেলার বর্ণনা নয়। এটি তাঁর আত্মপরিচয়, আত্মবিশ্বাস অর্জনের ইতিহাস এবং জীবনের পথে এগিয়ে যাওয়ার এক অনন্য প্রেরণা। যে মাইক্রোফোন একদিন তাঁকে খেলার মাঠে পরিচিত করেছিল, সেই মাইক্রোফোনই আজ তাঁকে পরিচয় করিয়ে দিয়েছে ভোলার সাংস্কৃতিক অঙ্গনের নানা পরিসরে।