
বরিশাল বিভাগে ইলিশের অভয়াশ্রম এলাকাগুলোতে প্রশাসনিক নজরদারির ঘাটতির অভিযোগ উঠেছে। দুই মাসের সরকারি নিষেধাজ্ঞা চলমান থাকলেও মেঘনা ও কীর্তনখোলা নদীর বিভিন্ন অংশে প্রকাশ্যেই জাটকা নিধন চলছে বলে স্থানীয়দের দাবি। বিশেষ করে ষষ্ঠ অভয়াশ্রমের আওতাধীন হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জ এলাকায় পরিস্থিতি বেশি উদ্বেগজনক বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।
মৎস্য অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, অভয়াশ্রমে ইলিশসহ সব ধরনের মাছ আহরণে বর্তমানে দুই মাসের নিষেধাজ্ঞা কার্যকর রয়েছে। তবে নিষেধাজ্ঞার এক মাস পার হলেও জাটকা নিধনের ঘটনায় কাউকে আইনের আওতায় আনা হয়নি।
বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত বছরের নিষেধাজ্ঞার প্রথম মাসে বিভাগের তিন জেলার ১৫ উপজেলায় মোট ৮৮০টি অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় ৭৪টি ভ্রাম্যমাণ আদালত বসিয়ে ৩৬ জেলেকে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল এবং জব্দ করা হয় ২ দশমিক ২৩৯ টন জাটকা।
অন্যদিকে চলতি বছরের মার্চ মাসে তিন জেলার ১৪ উপজেলায় অভিযান পরিচালিত হয়েছে ৬৪৪টি। ৬৮টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হলেও কোনো জেলেকে শাস্তি দেওয়া হয়নি। তবে জব্দ করা জাটকার পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৬ দশমিক ৬৩৫ টন, যা গত বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৩৯৬ টন বেশি।
সংশ্লিষ্টদের মতে, নজরদারির দুর্বলতা ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না থাকায় অভয়াশ্রমে জাটকা নিধন বেড়েছে। এতে ভবিষ্যতে ইলিশ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন নিয়ে সংশয় তৈরি হয়েছে।
জেলা মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, গত বছর নিষেধাজ্ঞার প্রথম মাসে বরিশালের তিন উপজেলায় ২০৩টি অভিযান চালিয়ে ১৬টি ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে ১২ জেলেকে কারাদণ্ড দেওয়া হয় এবং জব্দ করা হয় শূন্য দশমিক ৩৯৩ টন জাটকা। চলতি বছর একই সময়ে অভিযান বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১৩টিতে এবং ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালিত হয়েছে ২৯টি। কিন্তু কোনো জেলেকে শাস্তি দেওয়া হয়নি। এ সময় জব্দ করা হয়েছে ৪ দশমিক ৭২ টন জাটকা, যা আগের বছরের তুলনায় ৪ দশমিক ৩২৭ টন বেশি।
সদর উপজেলার টুঙ্গিবাড়িয়া ইউনিয়নের জেলে ফারুক বলেন, নিষেধাজ্ঞা মানলেও সরকারি সহায়তা নিয়মিত না পাওয়ায় অনেক জেলে জীবিকার তাগিদে নদীতে নামতে বাধ্য হচ্ছেন। তাঁর ভাষায়, “নিষেধাজ্ঞার সময় বরাদ্দের চাল ঠিকমতো পাই না। মাছ না ধরলে সংসার চলবে কীভাবে?”
তবে মৎস্য বিভাগের কর্মকর্তারা বলছেন, নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে কার্যক্রম অব্যাহত রয়েছে। বরিশাল বিভাগীয় মৎস্য অধিদপ্তরের পরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. কামরুল হাসান জানান, ইলিশ রক্ষায় গত বছরের তুলনায় এ বছর বেশি কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়েছে।
বরিশাল জেলা মৎস্য কর্মকর্তা ড. মো. হাদিউজ্জামান বলেন, অভয়াশ্রমে জাটকা সংরক্ষণে অভিযান নিয়মিত চলছে এবং বেশি পরিমাণ জাটকা জব্দ হওয়া ভবিষ্যতে ইলিশ উৎপাদন বৃদ্ধির ইঙ্গিত দেয়। তিনি আরও জানান, অভয়াশ্রম এলাকায় সাধারণত জেলেদের কঠোর শাস্তির আওতায় আনা হয় না। তবে হিজলা ও মেহেন্দীগঞ্জের মূল স্পটগুলোতে নজরদারি অব্যাহত রয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, টেকসই ইলিশ উৎপাদন নিশ্চিত করতে নিষেধাজ্ঞার পাশাপাশি কার্যকর নজরদারি, আইন প্রয়োগ এবং জেলেদের জন্য পর্যাপ্ত সামাজিক নিরাপত্তা সহায়তা নিশ্চিত করা জরুরি।