
গত কয়েক বছরে বাজারে পেঁয়াজের দামের অস্বাভাবিক ওঠানামা কৃষক ও ভোক্তা—উভয়ের জন্যই ভোগান্তির কারণ হয়েছে। তবে সেই পরিস্থিতিই ভোলার অনেক কৃষকের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে। ফলে জেলায় দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠছে পেঁয়াজ চাষ।
চলতি মৌসুমে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় পেঁয়াজের ভালো ফলন হওয়ায় কৃষকদের মুখে হাসি ফুটেছে। বর্তমানে মাঠ থেকে পেঁয়াজ তোলা, রোদে শুকানো এবং সংরক্ষণের কাজে ব্যস্ত সময় পার করছেন কৃষকেরা। কেউ কেউ আবার আগামী মৌসুমের জন্য বীজ সংরক্ষণেও মনোযোগ দিচ্ছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, অনুকূল আবহাওয়া, উন্নত জাতের বীজ এবং কৃষি বিভাগের পরামর্শের পাশাপাশি বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সহযোগিতায় এ বছর ভোলায় পেঁয়াজের আবাদ বেড়েছে। চলতি মৌসুমে জেলায় প্রায় ২৩৪ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ চাষ হয়েছে এবং উৎপাদন হয়েছে প্রায় ২ হাজার ৮০৮ মেট্রিক টন। বিশেষ করে সদর ও বোরহানউদ্দিন উপজেলায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণ জমিতে পেঁয়াজ আবাদ হয়েছে।
বোরহানউদ্দিন উপজেলার পক্ষিয়া ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের কৃষক জাকির মিজি বলেন, গত কয়েক বছরে বাজারে পেঁয়াজের দাম বাড়ায় অনেক সময় কিনতে গিয়ে সমস্যায় পড়তে হয়েছে। তাই ধানসহ অন্যান্য ফসলের পাশাপাশি নিজের জমিতেই পেঁয়াজ চাষ শুরু করেছেন তিনি।
একই এলাকার কৃষক সেলিম বেপারী বলেন, গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা (জিজেইউএস)-এর প্রশিক্ষণ ও সহযোগিতায় তারা আধুনিক পদ্ধতিতে পেঁয়াজ চাষ শিখেছেন। এ বছর আবহাওয়া অনুকূলে থাকায় ফলনও ভালো হয়েছে। বর্তমানে মাঠ থেকে পেঁয়াজ তুলে রোদে শুকিয়ে সংরক্ষণের কাজ চলছে। পাশাপাশি আগামী মৌসুমের জন্য বীজও সংরক্ষণ করছেন।
কৃষক মাকসুদ পাটোয়ারী জানান, তিনি ইতোমধ্যে প্রায় ২৫ মণ পেঁয়াজ বিক্রি করেছেন এবং ভালো দাম পেয়েছেন। পাশাপাশি ঘরে ব্যবহারের জন্য কিছু পেঁয়াজ সংরক্ষণ করে রেখেছেন এবং আগামী মৌসুমে চাষের জন্য বীজও রেখে দিচ্ছেন।
সদর উপজেলার পরানগঞ্জ এলাকার কৃষক শামসুদ্দিন বলেন, “এবার পেঁয়াজের ফলন ভালো হয়েছে। এখন আমরা মাঠ থেকে পেঁয়াজ তুলে শুকিয়ে ঘরে তুলছি। বাজারে দাম ভালো থাকলে কৃষকেরা লাভবান হবেন।”
কৃষকদের মতে, পেঁয়াজ সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে দীর্ঘ সময় ধরে বাজারে সরবরাহ করা সম্ভব হয়। এতে ন্যায্য দাম পাওয়ার সম্ভাবনাও বাড়ে।
গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা (জিজেইউএস)-এর টেকনিক্যাল অফিসার কৃষিবিদ মুরাদ হাসান চৌধুরী জানান, পল্লী কর্মসহায়ক ফাউন্ডেশনের সহযোগিতায় আরএমটিপি প্রকল্পের আওতায় কৃষকদের প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা এবং প্রদর্শনী প্লটের মাধ্যমে আধুনিক পদ্ধতিতে পেঁয়াজ চাষ শেখানো হয়েছে। ফলে অনেক কৃষক এবার প্রথমবারের মতো পেঁয়াজ চাষ করে ভালো ফলন পাচ্ছেন। পাশাপাশি কৃষকদের বীজ সংরক্ষণের সুবিধার জন্য একটি বীজ সংরক্ষণাগারও স্থাপন করা হয়েছে।
ভোলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশিক্ষণ কর্মকর্তা ড. শামিম আহমেদ বলেন, কৃষকদের আধুনিক পদ্ধতিতে পেঁয়াজ চাষ ও সংরক্ষণ বিষয়ে নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। ফলন বাড়াতে উন্নত জাতের বীজ ব্যবহারের ওপরও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক কৃষিবিদ খায়রু ইসলাম মল্লিক বলেন, “ভোলায় আগে পেঁয়াজ চাষ খুব কম হতো। তবে সাম্প্রতিক সময়ে কৃষকদের আগ্রহ বাড়ায় এ চাষ জনপ্রিয়তা পাচ্ছে। কৃষকদের সব ধরনের কারিগরি সহযোগিতা দেওয়া হচ্ছে।”
কৃষি বিভাগের আশা, সঠিকভাবে সংরক্ষণ করা গেলে চলতি মৌসুমে ভোলা জেলার কৃষকেরা পেঁয়াজ উৎপাদন থেকে ভালো লাভ করতে পারবেন এবং স্থানীয় বাজারে পেঁয়াজের সরবরাহও স্থিতিশীল থাকবে।