
উপকূলীয় জেলা ভোলা-তে লবণাক্ততার চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় নতুন সম্ভাবনা তৈরি করছে ‘বেড ও মাদা’ পদ্ধতিতে লবণ সহিষ্ণু সবজি চাষ। দীর্ঘদিন ধরে লবণাক্ততার কারণে যেখানে বছরের বড় একটি সময় বাড়ির আঙিনা অনাবাদি পড়ে থাকত, সেখানে এখন নারীরা নিজ বাড়িতেই বেগুন, টমেটো, বাঁধাকপি, ফুলকপি, লালশাক, পালংশাক, মুলা, শিম ও লাউসহ নানা ধরনের সবজি উৎপাদন করছেন।
স্থানীয় কৃষি বিভাগ ও মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুযায়ী, গ্রিন ক্লাইমেট ফান্ড এবং পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন-এর অর্থায়নে ভোলা সদর ও বোরহানউদ্দিন উপজেলায় গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা (জিজেইউএস) ৫০০ পরিবারকে প্রদর্শনী প্লট, প্রশিক্ষণ, কারিগরি সহায়তা, বীজ, সার, ওষুধ ও প্রয়োজনীয় উপকরণ বিতরণ করেছে। এর ফলে পারিবারিক পর্যায়ে সবজি চাষে ব্যাপক সাড়া পড়েছে।
এই পদ্ধতিতে জমির মাটি উঁচু করে বেড তৈরি করা হয়, যাতে লবণাক্ত পানি সরাসরি গাছের শিকড়ে প্রভাব ফেলতে না পারে। বেডে জৈব সার ও উপযুক্ত মাটির সংমিশ্রণ ব্যবহারের ফলে লবণাক্ততার ক্ষতি কমে এবং ফলন বৃদ্ধি পায়। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে উপকূলীয় এলাকায় লবণাক্ততা বাড়লেও এই পদ্ধতিকে কার্যকর বিকল্প হিসেবে দেখছেন কৃষি সংশ্লিষ্টরা।
ভোলা সদর উপজেলার ধানিয়া ইউনিয়নের তুলাতলি এলাকার গৃহিণী রহিমা বেগম বলেন, আগে বাড়ির আঙিনা ফাঁকা পড়ে থাকত। এখন সেখানে মৌসুমি সবজি চাষ করে পরিবারের পুষ্টি নিশ্চিত হচ্ছে। একই এলাকার জয়নব বেগম জানান, বাজার থেকে সবজি কেনার প্রয়োজন কমেছে, পাশাপাশি বাড়তি উৎপাদন বিক্রি করে মাসে কয়েক হাজার টাকা পর্যন্ত আয় করছেন।
বোরহানউদ্দিন উপজেলার পক্ষীয়া এলাকার ইয়াসমির বেগম বলেন, লবণাক্ততার কারণে আগে অনেক সময় কিছুই ফলানো যেত না। এখন বেড করে চাষ করায় ফলন ভালো হচ্ছে এবং সংসারের খরচ চালাতে সহায়তা মিলছে।
জিজেইউএস-এর উপপরিচালক ও আরএইচএল প্রকল্পের সমন্বয়কারী কৃষিবিদ আনিসুল রহমান টিপু বলেন, প্রদর্শনীভিত্তিক প্রশিক্ষণ ও উপকরণ সহায়তার মাধ্যমে পরিবারগুলোকে যুক্ত করায় এই পদ্ধতির সফলতা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। অনেক পরিবার এখন নিজেদের পুষ্টি চাহিদা মেটানোর পাশাপাশি বাজারে সবজি বিক্রি করে বাড়তি আয় করছে।
এ বিষয়ে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর ভোলার উপপরিচালক কৃষিবিদ খায়রু ইসলাম মল্লিক বলেন, লবণ সহিষ্ণু জাতের বীজ, প্রশিক্ষণ ও নিয়মিত পরামর্শ দেওয়ায় উদ্যোগটি সফল হচ্ছে। আরও বেশি পরিবার যুক্ত হলে উপকূলীয় অঞ্চলে পুষ্টি নিরাপত্তা ও আয়—দুই ক্ষেত্রেই টেকসই পরিবর্তন আসবে বলে তিনি আশাবাদী।
জলবায়ু পরিবর্তনের ঝুঁকিতে থাকা উপকূলীয় জেলাগুলোতে এমন উদ্ভাবনী কৃষি পদ্ধতির বিস্তার টেকসই উন্নয়নের নতুন পথ দেখাতে পারে। ভোলায় বেড ও মাদা পদ্ধতিতে সবজি চাষের সম্প্রসারণ সেই সম্ভাবনারই বাস্তব উদাহরণ।