
গাজায় যুদ্ধবিরতির আগের কয়েক সপ্তাহে ইসরায়েল গাজা সিটিতে একটি অস্বাভাবিক ও শক্তিশালী অস্ত্রব্যবস্থা ব্যাপকভাবে ব্যবহার করেছে—বিস্ফোরকবোঝাই এম১১৩ সাঁজোয়া যান (এপিসি)। রয়টার্সের অনুসন্ধানে দেখা গেছে, এসব যান এক থেকে তিন টন বিস্ফোরক বহন করে ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ভবন ধ্বংসে ব্যবহৃত হয়েছে।
রয়টার্স জানায়, অক্টোবর ১০-এর যুদ্ধবিরতির আগে গাজা সিটির কেন্দ্রের দিকে অগ্রসর হওয়ার সময় ইসরায়েলি বাহিনী এম১১৩ সাঁজোয়া যানকে বিস্ফোরক বাহনে রূপান্তর করে ব্যবহার করে। ড্রোন ফুটেজ ও স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা যায়, এসব বিস্ফোরণ, বিমান হামলা এবং সাঁজোয়া বুলডোজারের সঙ্গে মিলিত হয়ে তেল আল-হাওয়া ও সাবরা এলাকায় বিস্তীর্ণ ভবন ধ্বংস হয়।
রয়টার্সের অনুসন্ধান অনুযায়ী, অধিকাংশ ক্ষেত্রে বাসিন্দারা ইসরায়েলি সতর্কবার্তার পর এলাকা ছেড়ে গেলেও সব ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। তেল আল-হাওয়ার দাওলা স্ট্রিটে পাঁচতলা একটি বাড়ির মালিক হেশাম মোহাম্মদ বাদাওয়ি জানান, ১৪ সেপ্টেম্বর তার বাড়িটি একটি এপিসি বিস্ফোরণে সম্পূর্ণ ধ্বংস হয়। তিনি দাবি করেন, কোনো আগাম সরিয়ে নেওয়ার সতর্কতা ছাড়াই পাঁচ মিনিটের ব্যবধানে একাধিক বিস্ফোরণ ঘটে এবং তার পরিবারের ৪১ সদস্য অল্পের জন্য প্রাণে বাঁচেন। রয়টার্স জানিয়েছে, তারা ঘটনাটির সব বিবরণ স্বাধীনভাবে যাচাই করতে পারেনি এবং ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এ বিষয়ে প্রশ্নের জবাব দেয়নি।
রয়টার্সের অনুসন্ধানে অংশ নেওয়া তিনজন ইসরায়েলি নিরাপত্তা সূত্র, একজন অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল, একজন রিজার্ভ সেনাসদস্য, গাজার কর্তৃপক্ষ ও তিনজন সামরিক বিশেষজ্ঞ জানান, এপিসিতে এক থেকে তিন টন পর্যন্ত বিস্ফোরক ভরা হয়েছিল। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের বিস্ফোরণের শক্তি যুক্তরাষ্ট্রে নির্মিত ২,০০০ পাউন্ডের মার্ক-৮৪ বিমানবোমার কাছাকাছি হতে পারে এবং তা বহু তলা ভবন ধসিয়ে দেওয়ার সক্ষমতা রাখে।
সামরিক বিশেষজ্ঞরা রয়টার্সকে জানান, সাধারণত সেনা পরিবহনে ব্যবহৃত এপিসিকে বোমা হিসেবে ব্যবহার করা অত্যন্ত অস্বাভাবিক এবং এতে বেসামরিক স্থাপনার ব্যাপক ক্ষতির ঝুঁকি থাকে। ইসরায়েলের সেনাবাহিনী রয়টার্সকে জানায়, তারা যুদ্ধের নিয়ম মেনে চলে এবং কেবল “অপরিহার্য সামরিক প্রয়োজনে” প্রকৌশল সরঞ্জাম ব্যবহার করে, তবে বিস্তারিত জানায়নি।
হামাসের মুখপাত্র হাজেম কাসেম রয়টার্সকে বলেন, এসব ধ্বংসযজ্ঞের উদ্দেশ্য গাজা সিটির বাসিন্দাদের ব্যাপকভাবে বাস্তুচ্যুত করা, যা ইসরায়েল অস্বীকার করেছে। অন্যদিকে, জাতিসংঘ মানবাধিকার কার্যালয় ও আন্তর্জাতিক আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় এ ধরনের বৃহৎ বিস্ফোরক ব্যবহার মানবিক আইনের অনুপাত ও পার্থক্য নীতির লঙ্ঘন হতে পারে।
রয়টার্সের স্যাটেলাইট বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ১ সেপ্টেম্বর থেকে ১১ অক্টোবরের মধ্যে সাবরা, তেল আল-হাওয়া ও আশপাশের এলাকায় প্রায় ৬৫০টি ভবন ধ্বংস হয়। জাতিসংঘ স্যাটেলাইট সেন্টারের তথ্য বলছে, পুরো যুদ্ধে গাজার ৮১ শতাংশ ভবন ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে।
ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু এর আগে দাবি করেন, হামাস প্রায় প্রতিটি ভবনে বিস্ফোরক ফাঁদ পেতেছিল, তাই এপিসিতে বিস্ফোরক ভরে সেগুলো ধ্বংস করা হয়েছে। হামাস এ দাবি অস্বীকার করেছে এবং বলেছে, তাদের এমন সক্ষমতা নেই।
রয়টার্স জানায়, যুদ্ধ শুরুর আগে জনবহুল ও বাণিজ্যিকভাবে সক্রিয় তেল আল-হাওয়া ও সাবরা এলাকা এখন প্রায় সম্পূর্ণ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। কতগুলো এপিসি বিস্ফোরিত হয়েছে, তা নির্দিষ্ট করে নিশ্চিত করা যায়নি। গাজার সিভিল ডিফেন্সের দাবি, ওই সময়ে শত শত এপিসি বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে, তবে ইসরায়েলি সেনাবাহিনী এ সংখ্যার বিষয়ে মন্তব্য করেনি।