
দেশে মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা এখন প্রায় ৮২ লাখ, যা মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪.৮৮ শতাংশ। এর মধ্যে ৬০ শতাংশের বেশি প্রথমবার মাদক গ্রহণ করেছে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই। জাতীয় পর্যায়ের এক গবেষণায় উঠে এসেছে এই উদ্বেগজনক চিত্র।
মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের (ডিএনসি) অর্থায়নে গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনা করে বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় (বিএমইউ) ও রিসার্চ অ্যান্ড ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট লিমিটেড। রাজধানীর বিএমইউর সুপার স্পেশালাইজড হাসপাতালের কনফারেন্স হলে গতকাল রোববার ‘বাংলাদেশে মাদক অপব্যবহারকারী ব্যক্তিদের সংখ্যা, ধরন ও সংশ্লিষ্ট কারণগুলো’ শীর্ষক গবেষণার ফল প্রকাশ করা হয়।
গবেষণায় দেশের আট বিভাগের ১৩টি জেলা ও ২৬টি উপজেলা থেকে পাঁচ হাজার ২৮০ জনের তথ্য সংগ্রহ করা হয়েছে। এতে পরিমাণগত ও গুণগত—উভয় পদ্ধতি ব্যবহার করা হয়। সিগারেট সেবনকে এই গবেষণায় মাদক ব্যবহার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি।
বিভাগভিত্তিক চিত্র
গবেষণা অনুযায়ী, মাদক ব্যবহারকারীর সংখ্যা সবচেয়ে বেশি ঢাকা বিভাগে এবং সর্বনিম্ন বরিশাল বিভাগে। শহরাঞ্চলে ব্যবহারকারীর সংখ্যা তুলনামূলক বেশি হলেও গ্রামাঞ্চলেও এর বিস্তার দ্রুত বাড়ছে। সীমান্তবর্তী জেলা ও বড় শহরের আশপাশের এলাকায় মাদক ব্যবহার ও সরবরাহের ঝুঁকি বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
কিশোর-তরুণদের ঝুঁকি
গবেষণায় উঠে এসেছে, মাদক গ্রহণ শুরুর পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখে বন্ধুদের প্রভাব। পাশাপাশি কৌতূহল, পারিবারিক অশান্তি ও মানসিক চাপও গুরুত্বপূর্ণ কারণ। অনেক কিশোর সামাজিক পরিবেশ ও সঙ্গদোষে অল্প বয়সেই মাদকের সঙ্গে যুক্ত হয়ে পড়ছে।
গবেষণার প্রধান গবেষক ও বিএমইউর ডিন অধ্যাপক ডা. সাইফ উল্লাহ মুন্সী বলেন, দেশে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত মাদক গাঁজা। এরপর রয়েছে ইয়াবা, হেরোইন, ফেনসিডিল ও কোডিনজাত কাশির সিরাপ। তিনি জানান, ইনজেকশনের মাধ্যমে মাদক গ্রহণকারীর সংখ্যা উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে, যা এইচআইভি ও হেপাটাইটিসসহ সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি তৈরি করছে। বিষয়টি এখন বড় জনস্বাস্থ্য হুমকিতে পরিণত হয়েছে।
চিকিৎসা ও পুনর্বাসনে ঘাটতি
গবেষণায় দেখা যায়, মাদকাসক্তদের বড় একটি অংশ কখনো চিকিৎসা বা পুনর্বাসন সেবা নেয় না। যারা নেয়, তাদের অনেকেই ধারাবাহিক ও মানসম্মত সেবা পায় না। ফলে পুনরায় মাদক গ্রহণে ফিরে যাওয়ার ঝুঁকি থেকেই যায়।
ডিএনসির মহাপরিচালক হাসান মারুফ বলেন, মাদক ব্যবহার এখন আর বিচ্ছিন্ন কোনো সমস্যা নয়; এটি একটি বিস্তৃত জনস্বাস্থ্য ও সামাজিক সংকটে পরিণত হয়েছে। শুধু আইন-শৃঙ্খলা রক্ষা বাহিনীর মাধ্যমে মাদক নির্মূল সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠন—সবাইকে সম্পৃক্ত করে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তুলতে হবে।
তিনি জানান, ঢাকার বাইরে আরও সাতটি বিভাগে ২০০ শয্যা করে সাতটি মাদকাসক্ত নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের প্রকল্প অনুমোদন দিয়েছে সরকার। এসব কেন্দ্র চালু হলে বিভাগীয় পর্যায়ে চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সেবা বাড়বে।
‘সবাই ঝুঁকিতে’
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে বিএমইউর উপাচার্য অধ্যাপক ডা. শাহিনুল আলম বলেন, মাদক প্রতিরোধে রাজনৈতিক অঙ্গীকার ও গবেষণার বিকল্প নেই। এটি ভাবার সুযোগ নেই যে কেবল কিছু মানুষই ঝুঁকিতে রয়েছে; সমাজের সবাই সম্ভাব্য ঝুঁকির মধ্যে আছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক ডা. নাহরীন আখতার বলেন, সরবরাহ নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি চাহিদা কমানোও জরুরি। বিশেষ করে শিশু ও তরুণদের লক্ষ্য করে সমন্বিত সচেতনতামূলক কার্যক্রম জোরদার করতে হবে।
গবেষণার সারসংক্ষেপে বলা হয়, মাদক সমস্যা শুধু আইন-শৃঙ্খলার বিষয় নয়; এটি একটি বড় জনস্বাস্থ্য চ্যালেঞ্জ। প্রতিরোধের পাশাপাশি চিকিৎসা, পুনর্বাসন এবং সমাজে পুনঃঅন্তর্ভুক্তির সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া পরিস্থিতির উন্নতি সম্ভব নয়।