
তেহরান-ওয়াশিংটন: চাকা আবিষ্কারের মাধ্যমে মেসোপটেমীয় সভ্যতায় যে গতির সঞ্চার হয়েছিল, অষ্টাদশ শতাব্দীতে জেমস ওয়াটের বাষ্পীয় ইঞ্জিন তা পূর্ণতা পায়। কিন্তু আধুনিক সভ্যতার চাকা সচল রাখতে আজ যে ‘তেল’ বা জ্বালানির প্রয়োজন, তাই এখন বিশ্ব মোড়লদের জন্য সাম্রাজ্য বিস্তারের প্রধান হাতিয়ার। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে মধ্যপ্রাচ্যে শুরু হওয়া ইরান-ইসরায়েল-মার্কিন সংঘাত কেবল কোনো আদর্শিক লড়াই নয়, বরং এর গভীরে প্রোথিত রয়েছে ২০০ বিলিয়ন ব্যারেল তেলের মালিকানা ও ভূ-রাজনৈতিক আধিপত্যের তীব্র আকাঙ্ক্ষা।
তেলের মরণকামড়: কেন লক্ষ্যবস্তু ইরান?
ইরান বর্তমানে বিশ্বের তৃতীয় বৃহত্তম তেল মজুতকারী দেশ। বিশ্লেষকদের মতে, পারমাণবিক অস্ত্র বা ক্ষেপণাস্ত্র উন্নয়নের যে অভিযোগ ওয়াশিংটন তুলছে, তার আড়ালে রয়েছে ভেনেজুয়েলার মতো ইরানের তেলের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার নিগূঢ় অভিলাস। ১৯৫১ সালে মোহাম্মদ মোসাদ্দেকের তেল জাতীয়করণ থেকে শুরু করে ১৯৭৯ সালের ইসলামিক বিপ্লব—ইরানের ইতিহাস মূলত পশ্চিমাদের হাত থেকে নিজের খনিজ সম্পদ রক্ষার লড়াই। বর্তমান ট্রাম্প প্রশাসন সেই লড়াইকেই যুদ্ধের ময়দানে টেনে এনেছে।
রণকৌশলে ‘দাবার চাল’: ট্রাম্প বনাম খামেনি
বর্তমান যুদ্ধকে একটি ত্রিমাত্রিক দাবা খেলার সঙ্গে তুলনা করা হচ্ছে। যেখানে হোয়াইট হাউসের পরিকল্পনা ছিল ‘স্কলার চেকমেট’ বা দ্রুত ইরানকে কুপোকাত করা, সেখানে তেহরান যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করার ‘অপ্রচলিত’ কৌশল (Asymmetric Warfare) গ্রহণ করেছে।
মোজাইক ডিফেন্স: সরাসরি সম্মুখ যুদ্ধে না গিয়ে হিজবুল্লাহ ও হামাসের মতো ‘প্রক্সি’ ব্যবহার করে যুক্তরাষ্ট্রকে ক্লান্ত করা।
সস্তা বনাম দামি: যুক্তরাষ্ট্রের কয়েক মিলিয়ন ডলারের ক্ষেপণাস্ত্রের বিপরীতে ইরান ব্যবহার করছে সস্তা ড্রোন এবং নৌপথে গেরিলা স্পিডবোট।
হরমুজ প্রণালি ও তেলের বাজার: বিশ্বের ২০ শতাংশ তেল সরবরাহের পথ হরমুজ প্রণালিতে মাইন স্থাপন করে ইরান বিশ্ব অর্থনীতিকে জিম্মি করেছে। বর্তমানে ব্যারেল প্রতি তেলের দাম ১১২ ডলারে পৌঁছেছে, যা মার্কিন মিত্রদের জন্য চরম ‘দীর্ঘশ্বাস’ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
“ইরানের কৌশল হলো জয়ী হওয়া নয়, বরং পরাজয় ঠেকিয়ে যুদ্ধকে দীর্ঘায়িত করা, যাতে ট্রাম্পের ওপর অভ্যন্তরীণ ও অর্থনৈতিক চাপ বাড়ে।”
চীন ফ্যাক্টর: বদলে যাওয়া সমীকরণ
এই যুদ্ধের সবচেয়ে বড় মোড় হতে পারে ইরানের বন্দর ও প্রণালি ব্যবস্থাপনার দায়িত্ব চীনের হাতে তুলে দেওয়া। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, চীন যদি তাদের ‘ইউয়ান’ মুদ্রায় এই পথে টোল আদায় শুরু করে, তবে তা মার্কিন ডলার বা ‘পেট্রোডলার’-এর একচ্ছত্র আধিপত্যের কফিনে শেষ পেরেক হতে পারে। পরিস্থিতি এতটাই বেগতিক যে, জ্বালানি ঘাটতি মেটাতে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার ওপর থেকে তেলের নিষেধাজ্ঞা সাময়িকভাবে তুলে নিতে বাধ্য হয়েছে।
ক্ষয়ক্ষতির করুণ চিত্র
গত এক মাসের যুদ্ধে ক্ষয়ক্ষতি ও মুদ্রাস্ফীতিতে (১৪২%) ইরান বিধ্বস্ত হলেও মার্কিন বাহিনীও স্বস্তিতে নেই।
মানবিক বিপর্যয়: ইরানের ৩৮ হাজার লক্ষ্যবস্তুতে হামলায় ১,৪০০ জনের বেশি নিহত হয়েছে। এর মধ্যে শারজাহ তায়্যিবাহ স্কুলে হামলায় ১৬৮ জন শিক্ষার্থীর মৃত্যু বিশ্বজুড়ে নিন্দার ঝড় তুলেছে।
মার্কিন পিছুটান: প্রতি সপ্তাহে ৩.৫ বিলিয়ন ডলার যুদ্ধব্যয় মেলাতে হিমশিম খাচ্ছে ওয়াশিংটন। কাতার ও জর্ডানের ঘাঁটি থেকে ৪৫ হাজার মার্কিন কর্মীকে সরিয়ে নিতে বাধ্য হয়েছে ট্রাম্প প্রশাসন।
কূটনৈতিক গোলকধাঁধা: সমাধান কোথায়?
তুরস্কের প্রেসিডেন্ট এরদোয়ান এবং মিশরের মধ্যস্থতায় আলোচনার টেবিলে ট্রাম্প ১৫ দফা প্রস্তাব দিলেও ইরান অনড়। তেহরানের স্পষ্ট দাবি— মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন ঘাঁটি অপসারণ, যুদ্ধের ক্ষতিপূরণ এবং হরমুজ প্রণালির সার্বভৌমত্ব স্বীকার করতে হবে।
পরিশেষ: ১৮৮১ সালের ‘দ্য গ্রেট গেম’ আজ ২০২৬ সালে এসেও প্রাসঙ্গিক। সাম্রাজ্যবাদীরা বারবার নাম বদলায়, অজুহাত বদলায়, কিন্তু তাদের তেলের তৃষ্ণা মেটে না। পারস্য উপসাগরের নীল জল এখন তেলের কালো ছায়ায় আচ্ছন্ন। এই যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত কূটনৈতিক টেবিলে থামবে নাকি তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের দামামা বাজাবে, তা নির্ভর করছে ওয়াশিংটনের আধিপত্য ছাড়ার মানসিকতার ওপর।