
তাইওয়ানকে কার্যত অবরুদ্ধ করার মহড়ার অংশ হিসেবে চীন উত্তর ও দক্ষিণ তাইওয়ানের উপকূলবর্তী সাগরে রকেট নিক্ষেপ করেছে। মঙ্গলবার শুরু হওয়া এই সামরিক তৎপরতা বেইজিংয়ের এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বড় ও তাইওয়ানের সবচেয়ে কাছাকাছি যুদ্ধমহড়া বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট সূত্র।
রয়টার্সের তথ্যানুসারে, মঙ্গলবার চীনের সেনাবাহিনী তাইওয়ানের উত্তর ও দক্ষিণের জলসীমায় রকেট ছোড়ে এবং একই সঙ্গে নতুন অ্যাম্ফিবিয়াস অ্যাসল্ট জাহাজ, বোমারু বিমান ও ডেস্ট্রয়ার মোতায়েন করে। চীনের ইস্টার্ন থিয়েটার কমান্ড জানায়, ‘জাস্টিস মিশন ২০২৫’ নামে এই মহড়ায় পাঁচটি এলাকায় সকাল থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত (গ্রিনিচ সময় ১০টা) লাইভ-ফায়ার অনুশীলন চলবে, যার ফলে আশপাশের সাগর ও আকাশসীমা প্রভাবিত হচ্ছে।
চীনা সেনাবাহিনী প্রকাশিত এক ভিডিওতে একটি মোবাইল পিসিএইচ-১৯১ (PCH-191) রকেট লঞ্চারকে সাগরের দিকে রকেট ছুঁড়তে দেখা যায়। পাশাপাশি নৌ ও বিমান বাহিনী তাইওয়ানের উত্তর ও দক্ষিণে সামুদ্রিক ও আকাশ লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের মহড়া এবং সাবমেরিনবিরোধী অভিযান অনুশীলন করছে বলে জানানো হয়।
এই মহড়া শুরু হয়েছে যুক্তরাষ্ট্রের তাইওয়ানের জন্য রেকর্ড ১১.১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র সহায়তা ঘোষণার মাত্র ১১ দিন পর। ২০২২ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের স্পিকার ন্যান্সি পেলোসি তাইওয়ান সফরের পর এটি চীনের ষষ্ঠ বড় ধরনের সামরিক মহড়া।
তাইওয়ানের এক জ্যেষ্ঠ নিরাপত্তা কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, বেইজিং আগের মতো তাইওয়ানের ওপর দিয়ে ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করে কি না, তা নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে তাইপে। তাঁর মতে, এই মহড়ায় যুক্তরাষ্ট্র-নির্মিত হাইমার্স (HIMARS) রকেট সিস্টেমের মতো স্থলভিত্তিক লক্ষ্যবস্তুতে আঘাতের অনুশীলনও অন্তর্ভুক্ত থাকতে পারে। হাইমার্স একটি উচ্চগতির রকেট আর্টিলারি ব্যবস্থা, যার পাল্লা প্রায় ৩০০ কিলোমিটার।
চীনের পিসিএইচ-১৯১ একটি আধুনিক দীর্ঘপাল্লার রকেট লঞ্চার, যার সক্ষমতা হাইমার্সের সমতুল্য বলে দাবি চীনা রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমের। গত সেপ্টেম্বরে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সমাপ্তি উপলক্ষে অনুষ্ঠিত সামরিক কুচকাওয়াজে এই অস্ত্র প্রদর্শন করা হয়।
তাইওয়ানের প্রেসিডেন্ট লাই চিং-তে ফেসবুকে দেওয়া এক পোস্টে বলেন, সীমান্তে মোতায়েন সেনারা দ্বীপ রক্ষায় প্রস্তুত রয়েছে, তবে তাইপে পরিস্থিতি আরও উত্তপ্ত করতে চায় না। দেশটির প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় নিশ্চিত করেছে, মঙ্গলবার সকালে তাইওয়ানের উত্তরে লাইভ-ফায়ার অনুশীলন হয়েছে এবং কিছু ধ্বংসাবশেষ তাদের সংলগ্ন জলসীমায় (২৪ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত) পড়েছে।
তাইওয়ানের কোস্ট গার্ড জানিয়েছে, মঙ্গলবার পর্যন্ত ১৪টি চীনা কোস্ট গার্ড জাহাজ তাদের সংলগ্ন জলসীমায় টহল দিচ্ছিল এবং কয়েকটি ক্ষেত্রে দুই পক্ষের জাহাজ মুখোমুখি অবস্থানে ছিল। গত ২৪ ঘণ্টায় প্রায় ১৩০টি চীনা সামরিক বিমান এবং ২২টি নৌ ও কোস্ট গার্ড জাহাজ তাইওয়ানের আশপাশে সক্রিয় ছিল।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সম্ভাব্য অবরোধ তাইওয়ান ও আঞ্চলিক বাণিজ্যের জন্য মারাত্মকভাবে ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে পারে। প্রতিবছর প্রায় ২.৪৫ ট্রিলিয়ন ডলারের বাণিজ্য তাইওয়ান প্রণালি দিয়ে চলাচল করে। যদিও সামরিক মহড়ার কারণে তাইপের ১৪টি ফ্লাইট রুটের মধ্যে ১১টি প্রভাবিত হয়েছে, তবুও আন্তর্জাতিক ফ্লাইট বাতিল হয়নি বলে জানিয়েছে তাইওয়ানের বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ।
চীনা সংবাদমাধ্যমে প্রথমবারের মতো টাইপ-০৭৫ অ্যাম্ফিবিয়াস অ্যাসল্ট জাহাজ মোতায়েনের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে তুলে ধরা হয়েছে। চীনের ন্যাশনাল ডিফেন্স ইউনিভার্সিটির গবেষক ঝাং চি বলেন, এই জাহাজ একসঙ্গে হেলিকপ্টার, ল্যান্ডিং ক্রাফট, উভচর ট্যাংক ও সাঁজোয়া যান মোতায়েন করতে সক্ষম।
এদিকে যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিরক্ষা দপ্তরের একটি খসড়া প্রতিবেদনের বরাতে রয়টার্স জানায়, চীন ২০২৭ সালের মধ্যে তাইওয়ান নিয়ে যুদ্ধে জয়ী হওয়ার সক্ষমতা অর্জনের লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। তবে চীনা সামরিক বাহিনীতে দুর্নীতিবিরোধী অভিযানের কারণে তাদের প্রকৃত প্রস্তুতি নিয়ে প্রশ্নও উঠেছে।