ভোরের আলো তখনো পুরোপুরি ছড়িয়ে পড়েনি। চরসামাইয়ার পুকুরপাড়ে ব্যস্ততা শুরু হয়ে গেছে। পানিতে জাল ফেলতেই একসঙ্গে উঠে আসে অসংখ্য মাছ। কেউ জাল টানছেন, কেউ মাছ তুলে ঝুড়িতে রাখছেন। পাশে দাঁড়িয়ে পাইকারের লোকজন মাছ বাছাই করছেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই পুকুরপাড়ে এসে থামে পিকআপ ভ্যান। মাছ ওজন শেষে তা উঠে যায় গাড়িতে। এরপর সেই মাছ যাবে ভোলার বিভিন্ন বাজারে, কোনো চালান যাবে বরিশালেও।
চরসামাইয়ার এমন দৃশ্য এখন আর ব্যতিক্রম নয়। একসময় নদীকেন্দ্রিক জীবিকার জন্য পরিচিত ভোলা সদর উপজেলার এই ইউনিয়নে এখন নতুন করে পরিচয় তৈরি হয়েছে মাছ চাষকে ঘিরে। নদীর পানি ও জমিকে কাজে লাগিয়ে গড়ে উঠেছে শত শত পুকুর। এসব পুকুরে বাণিজ্যিকভাবে চাষ হচ্ছে তেলাপিয়া, পাঙাশ, রুই, কাতল, মৃগেলসহ বিভিন্ন প্রজাতির মাছ।
স্থানীয় চাষিদের হিসাবে, চরসামাইয়া ইউনিয়নে বছরে ২০০ কোটি টাকার বেশি মাছ কেনাবেচা হয়। ইউনিয়নে মাছ চাষে যুক্ত রয়েছেন পাঁচ শতাধিক চাষি। তাঁদের কেউ পেশায় ব্যবসায়ী, কেউ দোকানি, কেউ চাকরি করেন। আবার কেউ মাছ চাষকেই প্রধান পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন।
একটি পুকুর দিয়ে শুরু করে কারও খামার এখন ছড়িয়ে পড়েছে কয়েক ডজন পুকুরে। তাঁদেরই একজন মাকসুদ মাতাব্বর।
শূন্য থেকে শুরু করে বর্তমানে ৩৫টি পুকুরে মাছ চাষ করছেন মাকসুদ। তাঁর খামারে মাছ চাষ এখন শুধু একটি ব্যবসা নয়, পরিবারের আয়-ব্যয়ের বড় একটি ভরসা। তিনি বললেন, নদীর পানিতে মাছ তুলনামূলক দ্রুত বাড়ে। খাবারের খরচও অনেক ক্ষেত্রে কম পড়ে। ফলে উৎপাদন খরচ নিয়ন্ত্রণে রাখা যায়।
মাকসুদের মতো কয়েকজন চাষির সাফল্য দেখে অন্যরাও মাছ চাষে আগ্রহী হচ্ছেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, কয়েক বছর আগেও যাঁরা মাছ চাষকে বাড়তি আয়ের কাজ হিসেবে দেখতেন, তাঁদের অনেকেই এখন এটিকে ব্যবসা হিসেবে নিচ্ছেন।
মো. সানাউল্লাহ তাঁদের একজন। তাঁর মতে, বাজারে মাছের ভালো দাম পাওয়ায় চাষিদের আগ্রহ বাড়ছে। তাঁর দাবি, চরসামাইয়া থেকে বছরে প্রায় ২০০ কোটি টাকার মাছ কেনাবেচা হয়।
তবে এই পরিবর্তন শুধু পুকুরের সংখ্যা বাড়ার গল্প নয়। মাছ চাষের সঙ্গে বদল এসেছে উৎপাদন ব্যবস্থাপনাতেও। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার এখন অনেক খামারেই দেখা যাচ্ছে।
মো. নোমান তেলাপিয়া ও পাঙাশ চাষ করছেন। মাছের পুকুরে অক্সিজেনের মাত্রা ঠিক রাখতে ব্যবহার করছেন সার্জ এরেটর। মাছকে নির্দিষ্ট সময়ে খাবার দেওয়ার জন্য রয়েছে অটোমেটিক ফিডার মেশিন। এতে একদিকে শ্রম কমছে, অন্যদিকে নিয়মিত খাবার দেওয়ার কাজটিও সহজ হচ্ছে।
নুর নবীর খামারে রয়েছে পাঙাশ ও কার্পজাতীয় মাছ। রুই ও কাতল চাষ করছেন তিনি। তাঁর পুকুরে মাছের জন্য অক্সিজেন সরবরাহে ব্যবহার করা হচ্ছে সৌরবিদ্যুৎচালিত ফোর-হুইল এরেটর। বিদ্যুতের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে সৌরশক্তি ব্যবহার করার এই প্রযুক্তি খামারের পরিচালন ব্যয় নিয়ন্ত্রণেও ভূমিকা রাখছে।
আলাউদ্দিনের পুকুরে তেলাপিয়া ও পাঙাশ চাষ হচ্ছে। তিনি ব্যবহার করছেন সার্জ এরেটর ও ফিডিং ট্রে। নাজমা বেগমের পুকুরে রয়েছে রুই, কাতল ও মৃগেল। মাছের খাবার ব্যবস্থাপনায় ব্যবহার করছেন ফিডিং রিং, পাশাপাশি রয়েছে সার্জ এরেটর।
আর তাহের আলীর গল্প কিছুটা আলাদা। তিনি পুকুরের পাশাপাশি ভাসমান খাঁচায় তেলাপিয়া চাষ করছেন। পানির ওপর ভাসমান খাঁচায় মাছ চাষের এই পদ্ধতি জায়গার সর্বোচ্চ ব্যবহার নিশ্চিত করার একটি বিকল্প পথ তৈরি করেছে।
চাষিদের এসব উদ্যোগের পেছনে রয়েছে কারিগরি ও আর্থিক সহায়তাও। পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ)-এর সহযোগিতায় গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা (জিজেইউএস) বাস্তবায়িত SMART Fisheries উপ প্রকল্পের মাধ্যমে নির্বাচিত মাছচাষিরা বিভিন্ন ধরনের সহায়তা পেয়েছেন। প্রকল্পের আওতায় আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার, মাছের উৎপাদন ব্যবস্থাপনা ও খামার পরিচালনার বিষয়ে চাষিদের কারিগরি সহায়তা দেওয়া হচ্ছে।
চাষিদের ভাষ্য, আধুনিক যন্ত্রপাতির ব্যবহার মাছ চাষের কিছু কাজ সহজ করেছে। বিশেষ করে পুকুরে অক্সিজেন সরবরাহ, খাবার ব্যবস্থাপনা ও উৎপাদন পর্যবেক্ষণে প্রযুক্তি তাঁদের সময় ও শ্রম সাশ্রয় করছে।
চরসামাইয়ার মাছের অর্থনীতি অবশ্য পুকুরের পাড়েই থেমে নেই। ভোর হলেই ইউনিয়নের বিভিন্ন এলাকায় মাছের পাইকারদের আনাগোনা শুরু হয়। ভোলা শহর, বরিশালসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে ট্রাক ও পিকআপ ভ্যান নিয়ে তাঁরা হাজির হন।
পুকুর থেকে মাছ তোলার পর শুরু হয় বাছাই। কোন মাছ কত বড়, কোন বাজারে যাবে—এসব হিসাব করে মাছ আলাদা করা হয়। এরপর চলে ওজন। দরদাম ঠিক হওয়ার পর মাছ উঠে যায় পিকআপ বা ট্রাকে।
ব্যবসায়ী মো. আলাউদ্দিন বলেন, চরসামাইয়ার মাছের মান ভালো হওয়ায় বাজারে এর চাহিদা রয়েছে। তিনি এখান থেকে মাছ কিনে বিভিন্ন বাজারে সরবরাহ করেন।
আরেক ব্যবসায়ী মো. ফোরকানের ভাষায়, চরসামাইয়া এখন মাছের একটি বড় সংগ্রহকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে এখান থেকে মাছ কেনার জন্য বাইরের ব্যবসায়ীদের আগ্রহও বাড়ছে।
এই বেচাকেনার সঙ্গে যুক্ত মানুষের সংখ্যাও কম নয়। পুকুরে মাছ ধরা থেকে শুরু করে মাছ বাছাই, ওজন, খাদ্য সরবরাহ, পরিবহন ও বাজারজাতকরণ—প্রতিটি ধাপে তৈরি হয়েছে কাজের সুযোগ।
নদীতে মাছ কমে যাওয়ার কারণে যেসব জেলে আগের মতো আয় করতে পারছেন না, তাঁদের অনেকেই এখন মাছের খামারে শ্রমিক হিসেবে কাজ করছেন। কারও কাজ জাল টানা, কারও মাছ বাছাই করা, কেউ আবার মাছ পরিবহন করেন। কেউ কাজ করেন মাছের খাদ্য ও সরঞ্জাম সরবরাহের সঙ্গে।
ফলে একটি পুকুরের উৎপাদন স্থানীয় অর্থনীতির আরও অনেক মানুষের জীবিকার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যাচ্ছে।
চরসামাইয়ার এই পরিবর্তনের পেছনে অবশ্য নদীর বাস্তবতাও রয়েছে। একসময় নদী ছিল এই জনপদের মানুষের অন্যতম প্রধান জীবিকার উৎস। মাছ ধরতেন জেলেরা, নদীর সঙ্গে যুক্ত ছিল ব্যবসা-বাণিজ্য ও দৈনন্দিন জীবন। কিন্তু নদীতে মাছের উৎপাদন কমে যাওয়ায় আগের সেই নির্ভরতা অনেক পরিবারের জন্য আর আগের মতো কার্যকর নেই।
সেই জায়গায় পুকুরভিত্তিক মাছ চাষ তৈরি করেছে বিকল্প আয়ের পথ।
ভোলা সদর উপজেলার সিনিয়র উপজেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মেহেদী হাসান ভূঁইয়া বলেন, ‘চরসামাইয়ার মাছচাষিরা মাছ উৎপাদনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন। মৎস্য বিভাগও তাঁদের কারিগরি পরামর্শ, প্রশিক্ষণ ও আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহারে সহযোগিতা করছে।’
মৎস্য বিভাগের এই সহযোগিতার পাশাপাশি চাষিদের নিজস্ব উদ্যোগও এই পরিবর্তনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। কারণ মাছ চাষে লাভের সম্ভাবনা থাকলেও এটি ঝুঁকিমুক্ত নয়। মাছের খাদ্যের দাম, রোগবালাই, বাজারদর, আবহাওয়া ও উৎপাদন খরচ—সবকিছুর ওপর নির্ভর করে চাষির লাভ-লোকসান।
তারপরও চরসামাইয়ার মানুষ এই খাতে বিনিয়োগ বাড়াচ্ছেন। কারণ তাঁদের চোখের সামনে কয়েকজন চাষির সাফল্য তৈরি করেছে নতুন আস্থা।
একসময় যে ইউনিয়নের পরিচয় ছিল নদী আর জেলেদের জীবনকে ঘিরে, সেখানে এখন পুকুরের পানিতে ভেসে উঠছে নতুন অর্থনীতির ছবি। সকালে পুকুরে মাছ ধরা, দুপুরে বাছাই ও ওজন, বিকেলে বাজারে সরবরাহ—একটি মাছের পেছনে জড়িয়ে যাচ্ছে চাষি, শ্রমিক, খাদ্য ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী ও পাইকারের জীবন।
চরসামাইয়ার মানুষের কাছে তাই মাছ এখন শুধু খাদ্য নয়, একটি অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নামও। পাঁচ শতাধিক চাষি, শত শত পুকুর আর প্রতিদিনের বেচাকেনা মিলিয়ে গড়ে উঠছে একটি স্থানীয় মাছের বাজারব্যবস্থা।
চাষিদের হিসাব অনুযায়ী, বছরে ২০০ কোটি টাকার বেশি মাছের বেচাকেনা সেই পরিবর্তনেরই একটি বড় ইঙ্গিত। নদী থেকে পুকুরে জীবিকার এই রূপান্তর কতটা স্থায়ী হবে, তা নির্ভর করবে উৎপাদন খরচ, বাজারদর, রোগ ব্যবস্থাপনা, প্রযুক্তির ব্যবহার ও সরকারি-বেসরকারি সহায়তার ধারাবাহিকতার ওপর।
তবে এখনকার বাস্তবতা হলো, চরসামাইয়ার পুকুরে মাছ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বাড়ছে মানুষের কাজের সুযোগও। অনেক পরিবারের ঘরে ফিরছে আয়। আর ভোরের পুকুরপাড়ে জাল টানার সেই দৃশ্য বলে দিচ্ছে—একটি জনপদ তার পুরোনো জীবিকার পাশাপাশি নতুন পথও খুঁজে নিয়েছে।