দাদার কাছে ভবানীপুরের গল্প শুনতে শুনতেই আমার বড় হয়ে ওঠা। সেই গল্পে একটি বাড়ি ছিল, ছিল বড় উঠান, উঠানের এক পাশে গাছ, অন্য পাশে পুকুর। ছিল নদী। ছিল ফসলের মাঠ। ছিল আত্মীয়স্বজনের ভিড়। একই আকাশের নিচে, পাশাপাশি ঘরে, কাছাকাছি উঠানে বেড়ে ওঠা এক বড় পরিবার।
দাদার গল্পে ভবানীপুর ছিল খুব আপন একটি জায়গা। এতটাই আপন যে, কখনো কখনো মনে হতো, আমি বুঝি সেখানে গিয়েছি। সেই বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়েছি। নদীর পাড়ে হেঁটেছি। দূর থেকে নৌকা দেখেছি।
অথচ সত্যিটা একেবারেই অন্য রকম।
আমি কোনো দিন ভবানীপুর দেখিনি।
আমার জন্মের বহু আগেই মেঘনা নদী সেই জনপদকে নিজের বুকের ভেতর টেনে নিয়েছে।
তাই ভবানীপুর আমার কাছে একটি দেখা জায়গা নয়; একটি শোনা জায়গা। একটি স্মৃতি, যা আমার নিজের স্মৃতি নয়, অথচ আমার পরিচয়ের সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। দাদার মুখে শোনা সেই গল্পের ভেতর দিয়েই আমি আমার পূর্বপুরুষের বাড়িটিকে চিনেছি।
আমার দাদার বাবার বাড়ি ছিল ভোলার দৌলতখান উপজেলার ভবানীপুরে। একসময় সেখানে ছিল বসতভিটা, ছিল মানুষের বসবাস, ছিল পরিচিত মুখ। তারপর একদিন নদী এগিয়ে এসেছে। একটু একটু করে মাটি সরে গেছে। উঠান ছোট হয়েছে। ঘরের দূরত্ব কমেছে নদীর সঙ্গে। শেষ পর্যন্ত নদী আর বাড়ির মাঝখানে কোনো ফাঁকা জায়গা রাখেনি।
বাড়িটি চলে গেছে নদীর ভেতর।
তারপর পরিবারও চলে গেছে।
নতুন ঠিকানা হয়েছে পটুয়াখালীতে। সেখানে আবার ঘর উঠেছে, সংসার হয়েছে, সন্তান জন্মেছে। জীবন তার নিজের নিয়মে এগিয়ে গেছে। কিন্তু যে মাটি থেকে একটি পরিবারের গল্প শুরু হয়েছিল, সেই মাটির কাছে আর ফিরে যাওয়া হয়নি।
নদীভাঙনের সবচেয়ে নির্মম দিক সম্ভবত এটাই—মানুষকে শুধু তার ঘর থেকে সরিয়ে দেয় না, তার অতীত থেকেও দূরে সরিয়ে দেয়।
একটি বাড়ি হারালে মানুষ অন্য জায়গায় বাড়ি বানাতে পারে। নতুন জমি কিনতে পারে। নতুন ঘর তুলতে পারে। কিন্তু যে উঠানে তার বাবা খেলেছেন, যে গাছের ছায়ায় দাদা বসেছেন, যে পুকুরে পরিবারের শিশুরা সাঁতার শিখেছে—সেই জায়গাটি যখন নদী নিয়ে যায়, তখন তার বিকল্প আর তৈরি হয় না।
মেঘনা আমাদের সেই বিকল্পহীন জায়গাটিই কেড়ে নিয়েছে।
শুধু বাড়ি নয়, ছড়িয়ে দিয়েছে আত্মীয়স্বজনকেও।
একসময় যারা পাশাপাশি থাকতেন, তারা নদীভাঙনের পর ছড়িয়ে পড়েছেন ভোলা, বরিশাল, পটুয়াখালীসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায়। কারও সঙ্গে যোগাযোগ থেকেছে, কারও সঙ্গে কমেছে, কারও সঙ্গে একসময় পুরোপুরি হারিয়ে গেছে।
আমাদের পরিবারের গল্পেও সেই বিচ্ছিন্নতার ছাপ আছে।
এখন এমন আত্মীয় আছেন, যাদের নাম শুনেছি শুধু দাদার মুখে। কখনো দেখা হয়নি। এমন মানুষও আছেন, যাদের সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক আছে, কিন্তু পরিচয়ের সম্পর্ক নেই। বর্তমান প্রজন্মের অনেকে জানেই না, তাদের পূর্বপুরুষের বাড়ি কোথায় ছিল।
একসময় যারা ছিলেন প্রতিবেশী, তারা হয়ে গেছেন দূরের মানুষ। যারা ছিলেন আপনজন, তাদের সঙ্গে সম্পর্ক এখন শুধু পারিবারিক স্মৃতিতে।
নদী তাই আমাদের ভিটেমাটি ভাঙার পাশাপাশি আত্মীয়তার মানচিত্রও ভেঙে দিয়েছে।
ভবানীপুরের এই গল্প আসলে শুধু আমার পরিবারের গল্প নয়। এটি ভোলার বহু পরিবারের গল্প।
ভোলা এমন এক ভূখণ্ড, যার জন্ম ও অস্তিত্বই নদীর সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। এখানে নদী কখনো মাটি গড়ে, আবার কখনো সেই মাটিই কেড়ে নেয়। একদিকে চর জাগে, অন্যদিকে বসতি ভাঙে। কোথাও মানুষ নতুন জমি পেয়ে ঘর তোলে, আবার কোথাও পুরোনো ঘরের শেষ চিহ্নটিও হারিয়ে যায়।
দৌলতখানের ইতিহাসেও নদীভাঙনের এই দীর্ঘ ছায়া রয়েছে। যত টুক তথ্য জানতে পেরেছি সেই অনুযায়ী, ১৮৪৫ সালে ভোলা যখন মহকুমা হয়, তখন এর মূল কেন্দ্র ছিল এই দৌলতখান। কিন্তু ১৮৭৬ সালে মেঘনার তীব্র ভাঙনের মুখে টিকতে না পেরে মহকুমা সদর দপ্তর দৌলতখান থেকে বর্তমান ভোলা শহরে স্থানান্তরিত করতে বাধ্য হয় তৎকালীন প্রশাসন। ১৮৬৭-১৮৭৬ সালের দিকে শুরু হলেও, ভবানীপুর ইউনিয়নের মানচিত্র বদলে দেওয়া বিধ্বংসী ভাঙনটি মূলত ১৯৭০-এর দশকের পর থেকে শুরু হয়ে ১৯৯০ ও ২০০০-এর দশকে সবচেয়ে মারাত্মক আকার ধারণ করে। মেঘনার ভাঙনে হাজিপুর ইউনিয়নও মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এমনকি মধ্য হাজিপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার তথ্য রয়েছে।
এই ইতিহাস পড়তে গেলে মনে হয়, ভোলার মানুষের জীবনে নদী যেন কোনো বাইরের দুর্যোগ নয়। নদী তাদের প্রতিদিনের জীবনের অংশ। নদীর পানি যেমন তাদের জীবন দেয়, তেমনি নদীর ভাঙন তাদের জীবনকে বারবার নতুন করে শুরু করতে বাধ্য করে।
গত পাঁচ দশকের হিসাব আরও বড় একটি চিত্র সামনে আনে। বিভিন্ন প্রতিবেদন ও গবেষণায় বলা হয়েছে, এই সময়ে ভোলার মূল ভূখণ্ডের প্রায় ২৫৭ বর্গকিলোমিটার এলাকা মেঘনা ও তেঁতুলিয়ার গর্ভে বিলীন হয়েছে। জেলার প্রায় ৮০টি পয়েন্টে তীব্র নদীভাঙনের কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। রাজাপুর ইউনিয়নের ২০টি মৌজার মধ্যে ১৫টি এবং পূর্ব ইলিশা ইউনিয়নের চারটি মৌজা নদীগর্ভে চলে যাওয়ার তথ্য রয়েছে।
সংখ্যাগুলো বড়। কিন্তু সংখ্যার ভেতরের গল্পগুলো আরও বড়।
২৫৭ বর্গকিলোমিটার মানে শুধু একটি মানচিত্রের ছোট হয়ে যাওয়া নয়। এর ভেতরে আছে অসংখ্য মানুষের বাড়ি। আছে কৃষকের জমি। আছে কোনো মায়ের রান্নাঘর। আছে কোনো শিশুর প্রথম স্কুল। আছে কোনো বৃদ্ধের শেষ বয়সের আশ্রয়। আছে গাছের নিচে বসে বিকেল কাটানোর স্মৃতি।
একটি গ্রামের নাম হয়তো সরকারি নথিতে থাকবে। কিন্তু সেই গ্রামের মানুষ যদি ছড়িয়ে যায়, ঘর যদি নদীতে চলে যায়, বাজার যদি ভেঙে যায়, স্কুল যদি অন্যত্র সরিয়ে নিতে হয়, তাহলে গ্রামের যে সামাজিক জীবন ছিল—তা আর আগের মতো থাকে না।
মানুষের বসতি বদলে যায়। বদলে যায় সম্পর্ক। বদলে যায় স্থানীয় সংস্কৃতি।
শেষ পর্যন্ত বদলে যায় একটি জনপদের পরিচয়।
নদী কত দ্রুত নিজের সীমানা বদলায়, তারও বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে।
Regional Studies in Marine Science-এ ২০২১ সালে প্রকাশিত একটি গবেষণায় ১৯৮৯ থেকে ২০১৮ সাল পর্যন্ত স্যাটেলাইট চিত্র বিশ্লেষণ করা হয়। সেখানে ভোলা দ্বীপের পূর্বাঞ্চলের কিছু এলাকায় বছরে সর্বোচ্চ প্রায় ২৪৯ মিটার পর্যন্ত তীরভাঙনের হার পাওয়া গেছে। গবেষণায় নদীর প্রবাহ, জোয়ার-ভাটা, উজানের পানির চাপ, পলি পরিবহন ও নদী ব্যবস্থাপনার মতো বিভিন্ন উপাদানকে ভাঙন ও চর গঠনের সঙ্গে সম্পর্কিত করা হয়েছে।
২৪৯ মিটার—সংখ্যাটি কাগজে পড়লে হয়তো খুব বেশি কিছু মনে হয় না।
কিন্তু একজন নদীপাড়ের মানুষের কাছে ২৪৯ মিটার মানে তার ঘর থেকে নদীর দূরত্ব হঠাৎ কমে যাওয়া। মানে উঠানের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়ে নদীকে আরও কাছে দেখা। মানে রাতে ঘুমাতে যাওয়ার আগে মনে হওয়া—সকাল পর্যন্ত বাড়িটি থাকবে তো?
ভাঙনের মানুষ জানে, নদী কখনো নোটিশ দিয়ে আসে না।
একদিন নদী দূরে থাকে। পরদিন দেখা যায়, পাড়ের মাটি ফেটে গেছে। তারপর গাছ পড়ে যায়। রাস্তা ভেঙে যায়। ঘরের সামনে তৈরি হয় ফাঁকা জায়গা। আর এক সকালে মানুষ বুঝতে পারে—তার সামনে আর কোনো মাটি নেই।
শুধু নদী।
এই নদীর সঙ্গে মানুষের সম্পর্কের আরেকটি জটিল অধ্যায় বালু উত্তোলন।
ভোলার মেঘনা ও তেঁতুলিয়া থেকে ড্রেজার দিয়ে বালু উত্তোলন নিয়ে স্থানীয় মানুষের অভিযোগ ও উদ্বেগ দীর্ঘদিনের। কোথাও চর কেটে নেওয়ার অভিযোগ, কোথাও নদীর তীরের কাছ থেকে বালু তোলার অভিযোগ। স্থানীয় মানুষের আশঙ্কা, এসব কর্মকাণ্ড নদীর স্বাভাবিক ভারসাম্যে প্রভাব ফেলতে পারে।
তবে নদীভাঙনের প্রতিটি ঘটনাকে শুধু বালু উত্তোলনের ফল হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মেঘনা একটি অত্যন্ত গতিশীল নদীব্যবস্থা। এর ভাঙন ও চর গঠনের পেছনে নদীর প্রবাহ, পলি, জোয়ার-ভাটা, উজানের পানির চাপ, তলদেশের গঠনসহ নানা প্রাকৃতিক কারণ কাজ করে।
তবু প্রশ্ন থেকেই যায়—নদীর তলদেশে মানুষের হস্তক্ষেপ কতটা নিরাপদ?
ফাইলে সংকলিত গবেষণায় নদীর তলদেশের গভীরতা ও ঢালের পরিবর্তন এবং এর সঙ্গে তীরের স্থিতিশীলতার সম্পর্কের বিষয়টি উঠে এসেছে। চরের গা ঘেঁষে অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের ফলে নদীর তলদেশের ভারসাম্য বদলে গেলে তীরের মাটিতেও চাপ তৈরি হতে পারে।
তাই বালু উত্তোলনের প্রশ্নটি কেবল অর্থনীতি বা নির্মাণসামগ্রীর প্রশ্ন নয়। এটি নদীর স্বাভাবিক গতিপথ, পরিবেশ এবং মানুষের নিরাপত্তার প্রশ্নও।
কোথা থেকে বালু তোলা হবে, কতটুকু তোলা হবে, কোন সময়ে তোলা হবে—এসব সিদ্ধান্ত নদীর বৈজ্ঞানিক চরিত্র বুঝেই নেওয়া প্রয়োজন।
কারণ নদীকে আমরা যতটা একটি সম্পদ হিসেবে দেখি, নদী তার চেয়ে অনেক বেশি কিছু।
সে একটি জীবন্ত ব্যবস্থা।
চরের দিকে তাকালে এই সত্য আরও পরিষ্কার হয়।
আজ যে চরটি কেবল বালু আর কাদার বিস্তার বলে মনে হয়, কিছুদিন পর সেখানে ঘাস জন্মায়। ঘাসের ওপর গবাদিপশু চরে। জলাভূমিতে মাছ আসে। শীত এলে দূরদেশ থেকে পাখি আসে। মানুষ সেখানে অস্থায়ী বসতি গড়ে।
তথ্য অনুযায়ী, রামদেবপুর, বারাহীপুর, মধুপুর ও বৈরাগীর চরসহ বিভিন্ন চরাঞ্চলে বালু উত্তোলনের কারণে ঘাস ও তৃণভূমি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বৈরাগীর চরে প্রায় ৬৫০টি মহিষের একটি বাথান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার তথ্যও রয়েছে।
একটি চর তাই শুধু মানুষের জমি নয়।
চরের ঘাসের ওপর নির্ভর করে বাথান। নদীর তলদেশের ওপর নির্ভর করে মাছের জীবন। জলাভূমির ওপর নির্ভর করে পাখি। আর এই পুরো ব্যবস্থার ওপর নির্ভর করে মানুষ।
মেঘনা দেশের গুরুত্বপূর্ণ ইলিশের আবাস ও প্রজননক্ষেত্রগুলোর একটি। নদীর তলদেশে অতিরিক্ত যান্ত্রিক কর্মকাণ্ড এবং পলি পরিবেশের পরিবর্তন জলজ প্রাণীর স্বাভাবিক পরিবেশে প্রভাব ফেলতে পারে বলে ফাইলে সংকলিত গবেষণা ও প্রতিবেদনে উদ্বেগের কথা এসেছে।
শীতের চরগুলো আবার পরিযায়ী পাখিদেরও আশ্রয়। দূরদেশ থেকে আসা পাখিরা সেখানে খাবার খোঁজে, বিশ্রাম নেয়। মানুষের যন্ত্রের শব্দ আর অবিরাম কর্মকাণ্ড যদি সেই নীরবতা ভেঙে দেয়, তাহলে পাখিরা একদিন হয়তো অন্য কোনো চর বেছে নেবে।
কিন্তু নদীভাঙনের মানুষের যাওয়ার জায়গা কোথায়?
ভাঙন ঠেকাতে সরকারের উদ্যোগ আছে। ফাইলে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ভোলা সদর ও দৌলতখান উপজেলার শিবপুর, ধনিয়া ও মেদুয়া এলাকার বিস্তীর্ণ অংশ রক্ষায় প্রায় ৬৮৫ কোটি ৮৬ লাখ টাকার স্থায়ী তীর সংরক্ষণ বাঁধ প্রকল্প হাতে নেওয়া হয়েছে। স্থানীয় মানুষের প্রত্যাশা, অস্থায়ী জিওব্যাগের পাশাপাশি দীর্ঘমেয়াদি তীর সংরক্ষণ ব্যবস্থা দ্রুত বাস্তবায়িত হবে।
কিন্তু নদীর সময় আর মানুষের প্রশাসনিক সময় এক নয়।
একটি প্রকল্প অনুমোদন পেতে সময় লাগে। অর্থ বরাদ্দ লাগে। কাজ শুরু হতে সময় লাগে। কিন্তু নদীর ভাঙনের জন্য কোনো অনুমোদনের প্রয়োজন হয় না।
বর্ষার একটি রাতই যথেষ্ট।
একটি ঘর সরিয়ে নিতে হতে পারে। একটি গাছ পড়ে যেতে পারে। একটি রাস্তা নদীতে চলে যেতে পারে। একটি পরিবারকে আবারও বলতে হতে পারে—চল, এবার অন্য কোথাও ঘর করি।
এই ‘অন্য কোথাও’ খুঁজতে খুঁজতেই কত পরিবার যে তাদের নিজস্ব ঠিকানা হারিয়েছে, তার হিসাব হয়তো কোনো সরকারি নথিতে নেই।
নদীভাঙনের খবর করতে গিয়ে আমি বহুবার নদীর পাড়ে দাঁড়িয়েছি। ক্যামেরার সামনে মানুষের চোখের পানি দেখেছি। দেখেছি, নিজের হাতে গড়া ঘর ভেঙে মানুষ বাঁশ খুলছে। দেখেছি, একটি পরিবার তার শেষ সম্বলটুকু নৌকায় তুলে অন্য কোথাও যাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
কিন্তু ভবানীপুরের গল্প আমাকে অন্যভাবে স্পর্শ করে।
কারণ সেখানে আমি অন্য কারও ইতিহাস দেখি না।
আমি দেখি নিজের ইতিহাস।
দাদার মুখে শোনা বাড়িটি মনে পড়ে। মনে পড়ে সেই উঠানের গল্প। মনে পড়ে আত্মীয়স্বজনের কথা। তারপর নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে মনে হয়—যে মাটির ওপর দাঁড়িয়ে আজ অন্য কারও ঘর, সেটিও কি একদিন নদীর নিচে চলে যাবে?
নাকি কোনো একদিন আমার দেখা কোনো জনপদও শুধু গল্প হয়ে থাকবে?
এই প্রশ্নের উত্তর জানি না।
শুধু জানি, ভবানীপুর আজ আমার চোখে দেখা কোনো জায়গা নয়। অথচ সেটি আমার ভেতরে বেঁচে আছে।
দাদার কণ্ঠে।
পরিবারের গল্পে।
পুরোনো স্মৃতিতে।
আর নদীর পাড়ে দাঁড়ালে সেই অদৃশ্য ভবানীপুর যেন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
একটি নদী যখন ভাঙে, তখন প্রথমে মাটি ভাঙে।
তারপর ঘর।
তারপর রাস্তা।
তারপর বাজার।
তারপর মানুষের ঠিকানা।
কিন্তু এরও পরে যে জিনিসটি ভাঙে, তার কোনো দৃশ্যমান ছবি নেই।
সেটি হলো মানুষের শেকড়।
একটি পরিবার অন্য জায়গায় গিয়ে নতুন ঘর তুলতে পারে। সন্তান নতুন স্কুলে পড়তে পারে। নতুন জমিতে চাষ হতে পারে। নতুন বাজারে দোকান বসতে পারে।
কিন্তু পূর্বপুরুষের উঠানটি আর ফিরিয়ে আনা যায় না।
ফিরিয়ে আনা যায় না সেই গাছটি, যার নিচে দাদা বসতেন।
ফিরিয়ে আনা যায় না সেই পুকুর, যেখানে পরিবারের শিশুরা খেলত।
ফিরিয়ে আনা যায় না পাশাপাশি থাকা সেই বাড়িগুলো, যেখানে প্রতিটি দরজা খুললেই পরিচিত মুখ দেখা যেত।
তাই ভবানীপুর আমার কাছে একটি হারিয়ে যাওয়া জায়গার চেয়েও বেশি কিছু।
এটি মনে করিয়ে দেয়, নদী শুধু ভূগোল বদলায় না; মানুষের জীবনও বদলে দেয়।
একটি নদী যখন একটি জনপদকে গিলে নেয়, তখন শুধু কয়েক একর জমি হারায় না—হারায় একটি সামাজিক ইতিহাস।
আর সেই ইতিহাসের কিছু অংশ বেঁচে থাকে মানুষের মুখে মুখে।
দাদার মুখে শোনা ভবানীপুরও তেমনই একটি ইতিহাস।
আমি সেই ভবানীপুর কোনো দিন দেখিনি।
তবু মনে হয়, আমি তাকে চিনি।
হয়তো এটাই শেকড়ের সবচেয়ে আশ্চর্য শক্তি—মাটি হারিয়ে গেলেও তার স্মৃতি থেকে যায়।
মেঘনা আমাদের বাড়ি নিয়ে গেছে।
ঠিকানা নিয়ে গেছে।
আত্মীয়তার অনেক পথ মুছে দিয়েছে।
কিন্তু ভবানীপুরকে পুরোপুরি মুছে দিতে পারেনি।
কারণ ভবানীপুর এখন আর শুধু কোনো মানচিত্রে নেই।
ভবানীপুর আছে আমাদের গল্পে।
আর যতদিন সেই গল্প বলা হবে, ততদিন নদীর বুকের নিচে হারিয়ে যাওয়া সেই বাড়িটিও কোথাও না কোথাও বেঁচে থাকবে।