বরিশালের মুলাদী উপজেলায় আড়িয়াল খাঁ ও জয়ন্তী নদীর ভয়াবহ ভাঙনে সহস্রাধিক পরিবার দিশাহারা হয়ে পড়েছে। বর্ষা মৌসুমের শুরুতেই নদীর পানি বৃদ্ধি ও প্রবল স্রোতে শত শত বিঘা ফসলি জমি, বসতঘর ও গুরুত্বপূর্ণ সড়ক নদীগর্ভে বিলীন হয়েছে। এতে হুমকির মুখে পড়েছে একাধিক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাট-বাজার ও সামাজিক স্থাপনা।
সরেজমিনে উপজেলার চরকালেখান ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের লালন সরদারের বাড়ি থেকে আজিজ সরদারের বাড়ি পর্যন্ত নদীতীরবর্তী এলাকা ঘুরে ভাঙনের ভয়াবহ চিত্র দেখা গেছে। নদীর প্রবল স্রোতে পাড় ভেঙে পানি এখন বসতবাড়ির একেবারে কাছে চলে এসেছে। লালন সরদারের বাড়ি থেকে নদীর দূরত্ব কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ১৫ মিটারে।
স্থানীয় সূত্র মতে, চরকালেখান ইউনিয়নের পূর্ব বানীমর্দন সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়টি বর্তমানে নদীর তীর থেকে মাত্র ২০০ মিটার দূরে অবস্থান করছে। যেকোনো সময় বিদ্যালয়টি নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের মধ্যে চরম উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। এ ছাড়া নোমরহাট, বানীমর্দন দাখিল মাদ্রাসাসহ বেশ কয়েকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানও ভাঙনের ঝুঁকিতে রয়েছে। শুধু এই এলাকাতেই শতাধিক পরিবার ভিটেমাটি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছে।
চরকালেখান গ্রামের বাসিন্দা মো. নূরুল হক খান বলেন, ‘প্রতি বছর নদী ভাঙনে আমাদের শত শত একর জমি ও ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। চোখের সামনে নিজের ভিটাবাড়ি নদীতে তলিয়ে যেতে দেখার কষ্ট ভাষায় প্রকাশ করা যায় না। ভাঙন অব্যাহত থাকলে একদিন চরকালেখান ইউনিয়নের মানচিত্রই হারিয়ে যাবে। জিও ব্যাগ বা অস্থায়ী কোনো ব্যবস্থা নয়, আমরা চাই স্থায়ী নদী রক্ষা বাঁধ।’
চরকালেখান ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য মো. হান্নান চৌকিদার জানান, জয়ন্তী নদীর ভাঙনে ব্যাপারীর হাট নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। মুলাদী-সফিপুর সড়কের একটি অংশ ভেঙে যাওয়ায় যানবাহন চলাচল বন্ধ রয়েছে। ভেদুরিয়া, ছত্রিশ ভেদুরিয়া ও চরমালিয়াসহ বিভিন্ন এলাকার অনেক পরিবার ভিটেমাটি হারিয়েছে। তিনি সংসদ সদস্য ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বিত উদ্যোগে দ্রুত দৃশ্যমান ও স্থায়ী বেড়িবাঁধ নির্মাণের দাবি জানান।
একই সুরে চরকালেখান ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. মিরাজুল ইসলাম সরদার বলেন, ‘প্রতি বছর জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ফেলে অস্থায়ী প্রতিরোধের চেষ্টা করা হলেও তীব্র ভাঙন ঠেকানো সম্ভব হচ্ছে না। স্থায়ী সমাধানের জন্য বড় প্রকল্পের মাধ্যমে তীর রক্ষা বাঁধ নির্মাণ জরুরি।’
মুলাদী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা পরিষদের প্রশাসক মো. গোলাম সরওয়ার বলেন, ‘ক্ষতিগ্রস্ত এলাকা পরিদর্শনের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে এবং পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তাদের সঙ্গে আলোচনা করে জরুরি প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।’
বরিশাল পাউবোর বাবুগঞ্জ উপবিভাগীয় প্রকৌশলী মুশফিকুর রহমান শুভ জানান, ঝুঁকিপূর্ণ স্থানগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে জিও ব্যাগ ডাম্পিং করে ভাঙন ঠেকানোর কাজ চলছে। পাশাপাশি স্থায়ী সমাধানের জন্য বড় আকারের তীর সংরক্ষণ প্রকল্পের প্রস্তাবনা ও সমীক্ষা প্রক্রিয়াধীন রয়েছে।
এদিকে বরিশাল-৩ (মুলাদী-বাবুগঞ্জ) আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট জয়নুল আবেদীন নদীভাঙন রোধে সরকারের উচ্চপর্যায়ে উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন। পানিসম্পদমন্ত্রী বরাবর পাঠানো এক চিঠিতে তিনি মুলাদী ও বাবুগঞ্জ উপজেলার নদীভাঙন স্থায়ীভাবে রোধে বিশেষ মেগা প্রকল্প গ্রহণ ও প্রয়োজনীয় বরাদ্দের দাবি করেন। চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, মুলাদীর চরকালেখান, নাজিরপুর, গাছুয়া, সফিপুর, বাটামারা, কাজীরচর এবং বাবুগঞ্জের রহমতপুর, কেদারপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় নদীভাঙনের কারণে জনপদের মানচিত্র ক্রমেই সংকুচিত হচ্ছে।