সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ৪৫ বছর পলাতক থাকার পর সাবেক সেনা কর্মকর্তা মেজর (অব.) মোজাফফর হোসেনকে গ্রেপ্তার করেছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ। বুধবার (১৫ জুলাই) রাতে রাজধানীর বনানী থেকে তাকে আটক করে বৃহস্পতিবার (১৬ জুলাই) সেনাবাহিনীর কাছে হস্তান্তর করা হয়।
ডিএমপির ১৬ জুলাই প্রকাশিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, গোয়েন্দা নজরদারি ও তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় বুধবার রাত ১০টা ১০ মিনিটে বনানীর একটি বাসা থেকে মোজাফফরকে আটক করা হয়। জিজ্ঞাসাবাদে তার পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর সশস্ত্র বাহিনী বিভাগকে অবহিত করা হয়। পরদিন বৃহস্পতিবার সন্ধ্যা ৬টা ১০ মিনিটে ঢাকা সেনানিবাসে মিলিটারি পুলিশের একটি দলের কাছে তাকে হস্তান্তর করা হয়। বিজ্ঞপ্তিতে তাকে হত্যাকাণ্ডের ‘পলাতক আসামি’ হিসেবে উল্লেখ করা হলেও নির্দিষ্ট কোন অভিযোগ বা বিচারিক প্রক্রিয়ার বিস্তারিত জানানো হয়নি।
ঐতিহাসিক দলিল ও গ্রন্থে মোজাফফরের ভূমিকা নিয়ে বিভিন্ন বর্ণনা রয়েছে। সাংবাদিক অ্যান্থনি মাসকারেনহাসের ১৯৮৬ সালে প্রকাশিত ‘বাংলাদেশ: আ লেগাসি অব ব্লাড’ বইয়ে উল্লেখ করা হয়েছে, ১৯৮১ সালের ৩০ মে ভোরে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে জিয়াউর রহমান কক্ষ থেকে বেরিয়ে এলে তার কাছেই উপস্থিত ছিলেন মেজর মোজাফফর ও লেফটেন্যান্ট মোসলেহউদ্দিন। বইটির বর্ণনায় বলা হয়, মোজাফফর সে সময় দৃশ্যত কাঁপছিলেন এবং মোসলেহউদ্দিন জিয়াকে ভয় পাওয়ার কিছু নেই বলে আশ্বস্ত করেছিলেন। তাদের ধারণা ছিল, জিয়াকে হত্যা নয়, বরং সার্কিট হাউস থেকে তুলে নেওয়া হবে।
গ্রন্থটিতে আরও বলা হয়েছে, হত্যাকাণ্ডের প্রায় এক ঘণ্টা পর মেজর মোজাফফর, মেজর শওকত আলী ও মেজর রেজা সশস্ত্র সেনাসদস্যদের নিয়ে পুনরায় সার্কিট হাউসে যান এবং জিয়ার শোবার ঘরে তল্লাশি চালিয়ে ‘গোপন কাগজপত্র’ ও ব্যক্তিগত ডায়েরি খোঁজা হয়। পরে চট্টগ্রাম সেনানিবাসে মেজর জেনারেল মঞ্জুরের দপ্তরে অনুষ্ঠিত বৈঠকেও মোজাফফর উপস্থিত ছিলেন, যেখানে ‘বিপ্লবী পরিষদ’ গঠনের ঘোষণা দেওয়া হয়। বিদ্রোহ ব্যর্থ হওয়ার পর ১ জুন ভোরে মঞ্জুরসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা চট্টগ্রাম সেনানিবাস ছাড়েন। পথিমধ্যে সরকার-অনুগত সেনাদের সঙ্গে গোলাগুলিতে লে. কর্নেল মতিউর রহমান ও মাহবুব নিহত এবং ক্যাপ্টেন মুনীর গ্রেপ্তার হলেও মোজাফফর পালিয়ে যেতে সক্ষম হন।
জিয়া হত্যার পর সামরিক আদালতে ১৮ সেনা কর্মকর্তার বিচার হয়, যার মধ্যে ১৩ জনের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হয়। তবে মেজর এস এম খালেদ ও মোজাফফর পলাতক থাকায় তাদের ধরিয়ে দিতে পুরস্কার ঘোষণা করা হয়েছিল। পলাতক জীবন নিয়ে মেজর জেনারেল (অব.) মইনুল হোসেন চৌধুরীর স্মৃতিকথা ‘এক জেনারেলের নীরব সাক্ষ্য: স্বাধীনতার প্রথম দশক’-তে উল্লেখ রয়েছে, ১৯৮৯ থেকে ১৯৯৩ সাল পর্যন্ত থাইল্যান্ডে রাষ্ট্রদূত থাকাকালে তিনি জানতে পারেন মোজাফফর ভারত থেকে ব্যাংককে গিয়ে মেজর খালেদকে সঙ্গে নিয়ে তার সঙ্গে দেখা করেন। তাদের দাবি ছিল, জিয়াকে চাপ দিয়ে তৎকালীন সেনাপ্রধান এরশাদসহ কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা ও মন্ত্রীকে অপসারণ করানোই ছিল তাদের উদ্দেশ্য, হত্যার পরিকল্পনা আগে থেকে জানতেন না।
দীর্ঘ ৪৫ বছর পলাতক জীবন শেষে মোজাফফরের গ্রেপ্তারের ফলে কয়েকটি অমীমাংসিত প্রশ্ন নতুন করে সামনে এসেছে। তিনি কত বছর ভারতে ছিলেন, কী পরিচয়ে ব্যাংককে যাতায়াত করতেন এবং বনানীতে কত দিন ধরে কার সহায়তায় আত্মগোপনে ছিলেন—এসব বিষয়ে সরকারিভাবে কোনো তথ্য দেওয়া হয়নি। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানাচ্ছে, তার জিজ্ঞাসাবাদের মাধ্যমে হত্যার আগে কর্মকর্তাদের কী বলা হয়েছিল, পরিকল্পনায় আর কারা যুক্ত ছিলেন এবং হত্যার পর জিয়ার কক্ষে কী খোঁজা হয়েছিল—এসব ঐতিহাসিক রহস্য উন্মোচনে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তবে আনুষ্ঠানিক অভিযোগের নথি বা পুরোনো সামরিক তদন্তের ফলাফল জনসমক্ষে আসার আগেই তার বক্তব্য আনুষ্ঠানিক তদন্ত ও বিচারিক যাচাইয়ের অপেক্ষায় রয়েছে।