রাজধানীর মগবাজারে অবস্থিত আদ্-দ্বীন হাসপাতালে ছয় নবজাতকের অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিল করেছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া কারণ দর্শানোর নোটিসের জবাব সন্তোষজনক না হওয়ায় এ সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে অধিদপ্তর।
বৃহস্পতিবার বিকেলে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সম্মেলন কক্ষে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ ঘোষণা দেন স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস।
তিনি বলেন, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া ব্যাখ্যা কর্তৃপক্ষের কাছে সন্তোষজনক মনে হয়নি। এ কারণে ‘মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স, ১৯৮২’-এর ১১(২)(খ) ধারা অনুযায়ী আদ্-দ্বীন হাসপাতালের লাইসেন্স বাতিল করা হয়েছে।
তবে সংশ্লিষ্ট আইনের ১২ ধারা অনুযায়ী লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আগামী ৩০ দিনের মধ্যে সরকারের কাছে আপিল বা পুনর্বিবেচনার আবেদন করার সুযোগ রয়েছে বলেও জানান তিনি।
সংবাদ সম্মেলনে হাসপাতালের বর্তমানে চিকিৎসাধীন রোগীদের বিষয়ে জানতে চাইলে ডা. প্রভাত চন্দ্র বিশ্বাস বলেন, লাইসেন্স বাতিল হওয়ার পর প্রতিষ্ঠানটি আর চিকিৎসাসেবা দিতে পারবে না। তাই দ্রুততম সময়ের মধ্যে রোগীদের অন্য হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হবে।
ঈদের আগের দিন ২৭ মে সকালে আদ্-দ্বীন হাসপাতালের পোস্ট-ডেলিভারি ওয়ার্ডে একে একে ছয় নবজাতকের মৃত্যু হয়। ঘটনাটি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করে। পরে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গঠিত তদন্ত কমিটি তাদের প্রতিবেদনে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের অবহেলার প্রমাণ পাওয়ার কথা উল্লেখ করে।
তদন্ত প্রতিবেদনে বলা হয়, ওয়ার্ডে অতিরিক্ত মানুষের উপস্থিতি, দীর্ঘ সময় শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থা (এসি) বন্ধ থাকা এবং বিকল্প বায়ু চলাচলের ব্যবস্থা না থাকায় বাতাসে কার্বন ডাই-অক্সাইডের মাত্রা বেড়ে যায়। এসব কারণেই নবজাতকদের মৃত্যুর ঘটনা ঘটতে পারে বলে পর্যবেক্ষণে উল্লেখ করা হয়।
গত ৪ জুন এক সংবাদ সম্মেলনে তদন্ত কমিটির পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বকুল। একই দিন স্বাস্থ্য অধিদপ্তর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষকে কারণ দর্শানোর নোটিস দেয়। নোটিসে ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালের লাইসেন্স কেন বাতিল করা হবে না, সে বিষয়ে ৭ জুনের মধ্যে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়।
পরে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা জমা দেওয়ার জন্য আরও ৪৮ ঘণ্টা সময় বাড়ানো হয়। তবে বুধবার স্বাস্থ্যমন্ত্রী জানান, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের দেওয়া জবাব সন্তোষজনক নয়।
এদিকে নবজাতকদের মৃত্যুর ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর জন্য ক্ষতিপূরণ ঘোষণা করেছে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ। হাসপাতালের আইনজীবী শিশির মনির গত রোববার সাংবাদিকদের জানান, নিহত প্রতিটি নবজাতকের পরিবারকে ৮০ লাখ টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়েছে।
তিনি দাবি করেন, পরিবারগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নির্ধারণ করা হয়েছে এবং ইতোমধ্যে প্রতিটি পরিবারকে ১০ লাখ টাকা করে প্রদান করা হয়েছে।
তবে ক্ষতিপূরণ ও হাসপাতালের বিরুদ্ধে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপের বিষয়ে স্বাস্থ্যমন্ত্রী বুধবার বলেন, সরকারের পক্ষ থেকে আইনজীবী নিয়োগ করে তদন্ত প্রতিবেদন ও গৃহীত সিদ্ধান্তের বিষয়ে প্রয়োজনীয় আইনি সুপারিশ করা হবে।
ছয় নবজাতকের মৃত্যুর ঘটনায় হাসপাতালটির লাইসেন্স বাতিলের সিদ্ধান্ত দেশের বেসরকারি স্বাস্থ্যসেবা খাতে জবাবদিহিতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করার প্রশ্নকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।