পবিত্র ঈদুল আজহাকে ঘিরে দেশের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রের মতো দ্বীপ জেলা ভোলাতেও বেড়েছে ভ্রমণপিপাসু মানুষের আগ্রহ। দীর্ঘ ছুটিকে কেন্দ্র করে পরিবার কিংবা বন্ধুদের সঙ্গে প্রকৃতির কাছাকাছি কিছুটা সময় কাটানোর পরিকল্পনা করছেন অনেকে। প্রতিবছরের মতো এবারও জনপ্রিয় গন্তব্য হিসেবে অনেকের পছন্দের তালিকায় রয়েছে কক্সবাজার, কুয়াকাটা কিংবা পাহাড়ি অঞ্চলগুলো। তবে ভিড়ভাট্টা আর কোলাহলের বাইরে নিরিবিলি, প্রকৃতিনির্ভর এবং বৈচিত্র্যময় ভ্রমণ অভিজ্ঞতা খুঁজে থাকলে দক্ষিণের উপকূলীয় এই দ্বীপ জেলা হতে পারে এক অনন্য গন্তব্য।
বাংলাদেশের একমাত্র দ্বীপ জেলা হিসেবে ভোলার বিশেষত্ব কেবল এর ভৌগোলিক অবস্থানেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং নদী, সমুদ্র, চরাঞ্চল, বনভূমি এবং উপকূলীয় জনজীবনের মেলবন্ধন একে দেশের অন্যসব পর্যটনকেন্দ্র থেকে আলাদা করেছে। একদিকে মেঘনা নদী, অন্যদিকে তেঁতুলিয়া নদী আর দক্ষিণে বঙ্গোপসাগরকে ঘিরে গড়ে ওঠা ভোলার প্রাকৃতিক আবহ যেন নিজস্ব এক সৌন্দর্যের গল্প বলে। এখানে যাত্রাপথও ভ্রমণের আনন্দের অংশ হয়ে ওঠে। নদীপথে লঞ্চ ভ্রমণ, চরাঞ্চলের বিস্তৃত সবুজ আর উপকূলীয় বাতাস পর্যটকদের মনে এনে দেয় ভিন্ন এক অনুভূতি।
বিশেষ করে ভোলার চরফ্যাশন উপজেলার পর্যটনকেন্দ্রগুলো ইতোমধ্যে পর্যটকদের নজর কাড়তে শুরু করেছে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি আধুনিক অবকাঠামো, নিরাপদ পরিবেশ এবং তুলনামূলক কম ভিড়ের কারণে ঈদের ছুটিতে ভোলা হয়ে উঠছে আকর্ষণীয় গন্তব্য। এখানকার দৃষ্টিনন্দন ওয়াচ টাওয়ার, ফ্যাশন স্কয়ার, শিশু ও বিনোদন পার্ক, উপকূলীয় দ্বীপ, বনাঞ্চল এবং নির্জন সৈকত এখন পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর অন্যতম জনপ্রিয় স্থান হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছে।
চরফ্যাশনের সবচেয়ে আলোচিত আকর্ষণগুলোর অন্যতম হলো নান্দনিক ওয়াচ টাওয়ার। প্রায় ২০ কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত ২২৫ ফুট উচ্চতার এই স্থাপনাটি স্থানীয়দের কাছে ‘বাংলার আইফেল টাওয়ার’ নামেও পরিচিত। এখান থেকে বাইনোকুলারের সাহায্যে দূরের উপকূলীয় বিস্তৃতি, চরাঞ্চল, নদী আর সমুদ্রের মিলনরেখা দেখা যায়। আকাশছোঁয়া এই টাওয়ারের পাদদেশেই রয়েছে বিশাল পরিসরের ফ্যাশন স্কয়ার, যেখানে পানির ফোয়ারা, উন্মুক্ত বিনোদন এলাকা এবং পারিবারিক আড্ডার পরিবেশ পর্যটকদের বাড়তি আনন্দ দেয়। শিশুদের জন্য আলাদা বিনোদন পার্ক থাকায় ঈদের ছুটিতে পরিবার নিয়ে সময় কাটানোর জন্য স্থানটি হয়ে উঠেছে বিশেষ আকর্ষণ।
ভ্রমণপিপাসুদের কাছে ভোলার অন্যতম আকর্ষণ মনপুরা দ্বীপ। প্রকৃতির নিস্তব্ধতা, খোলা আকাশ, নদীঘেরা পরিবেশ আর গ্রামীণ জীবনযাত্রার সরলতা মনপুরাকে আলাদা পরিচিতি দিয়েছে। শহুরে জীবনের ব্যস্ততা থেকে দূরে কিছুটা শান্ত সময় কাটাতে অনেকেই এখন মনপুরাকে বেছে নিচ্ছেন। দ্বীপজুড়ে ছড়িয়ে থাকা সবুজ, নদীপাড়ের বাতাস আর সূর্যাস্তের দৃশ্য অনেকের কাছেই হয়ে ওঠে মানসিক প্রশান্তির উৎস। মনপুরার দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত দখিনা হাওয়া সৈকতও ধীরে ধীরে পর্যটকদের কাছে পরিচিতি পাচ্ছে নিরিবিলি উপকূলীয় সৌন্দর্যের জন্য।
অন্যদিকে উপকূলীয় জীববৈচিত্র্য আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের অনন্য মেলবন্ধন দেখা যায় চর কুকরি-মুকরিতে। অনেকেই একে ‘মিনি সুন্দরবন’ বলে অভিহিত করেন। ভোলা শহর থেকে প্রায় ১২০ কিলোমিটার দূরে অবস্থিত এই অভয়ারণ্যে রয়েছে ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল, হরিণ, বানর এবং নানা প্রজাতির পাখির বিচরণ। নদী আর সমুদ্রঘেঁষা প্রাকৃতিক পরিবেশ জায়গাটিকে দিয়েছে ভিন্ন মাত্রা। আধুনিক পর্যটনকেন্দ্রের কৃত্রিমতা থেকে দূরে এখানকার প্রকৃতি এখনো অনেকটাই অক্ষত। অনেক পর্যটক নির্জন পরিবেশে তাবু খাটিয়ে রাত্রিযাপনের অভিজ্ঞতার জন্যও এখন কুকরি-মুকরিকে বেছে নিচ্ছেন।
কুকরি-মুকরির কাছেই রয়েছে ঢালচরের তারুয়া দ্বীপ, যা প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের আরেক বিস্ময়। বিস্তীর্ণ বালুকাবেলা, লাল কাঁকড়ার বিচরণ, সর্পিল জলাধার আর নারিকেলবেষ্টিত পরিবেশ সৈকতটিকে দিয়েছে স্বতন্ত্র পরিচিতি। ভিড়ভাট্টা থেকে দূরে যারা সমুদ্রের নির্জনতা উপভোগ করতে চান, তাদের জন্য এটি হতে পারে ব্যতিক্রমী অভিজ্ঞতা। একইভাবে খেজুরগাছিয়া এলাকার ‘মিনি কক্সবাজার’ সৈকতও এখন স্থানীয় ও বাইরের পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে উঠছে।
উপকূলীয় এলাকায় অবস্থিত বাতিঘর ও কোস্টাল রেডিও স্টেশনও পর্যটকদের কাছে বাড়তি আকর্ষণ সৃষ্টি করছে। এসব স্থাপনা শুধু দৃষ্টিনন্দনই নয়, বরং সমুদ্রগামী জাহাজ ও মাছ ধরার ট্রলারকে দিকনির্দেশনা দেওয়া এবং বৈরী আবহাওয়ার আগাম বার্তা পৌঁছে দেওয়ার গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও পালন করে। কুকরি-মুকরি এলাকায় পর্যটকদের জন্য রেস্ট হাউস, হেলিপ্যাড এবং সুইমিংপুলের মতো কিছু আধুনিক সুযোগ-সুবিধাও আছে। তবে রাতে ক্যাম্পেইন করার জন্য অনেকেই কুকরি মুকরি কে ই এখন প্রথম পছন্দে রাখছেন।
শুধু প্রকৃতি নয়, ইতিহাস ও স্থাপত্যপ্রেমীদের জন্যও ভোলায় রয়েছে আলাদা আকর্ষণ। ভোলা সদরে নির্মিত দৃষ্টিনন্দন নিজাম হাসিনা ফাউন্ডেশন মসজিদ ও বাংলাবাজারের ফাতেমা খানম জামে মসজিদ আধুনিক স্থাপত্যশৈলী আর নান্দনিক নির্মাণে সহজেই নজর কাড়ে। পাশাপাশি বীরশ্রেষ্ঠ মোস্তফা কামাল স্মৃতি জাদুঘর মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস জানতে আগ্রহীদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান।
প্রকৃতির পাশাপাশি খাদ্যসংস্কৃতিও ভোলার অন্যতম আকর্ষণ। উপকূলীয় এই জেলায় গেলে স্থানীয় খাবারের স্বাদ নেওয়া যেন ভ্রমণেরই অংশ। বিশেষ করে মহিষের দুধের তৈরি ঐতিহ্যবাহী টক দইয়ের খ্যাতি বহুদিনের। মাটির পাত্রে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি এই দইয়ের স্বাদ অনেকের কাছেই স্মরণীয় হয়ে থাকে। পাশাপাশি ইলিশ মাছসহ মেঘনা ও সাগর মোহনার তাজা মাছের স্বাদও পর্যটকদের কাছে আলাদা অভিজ্ঞতা এনে দেয়।
ঈদের ছুটিকে সামনে রেখে পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতেও প্রশাসনের পক্ষ থেকে নেওয়া হয়েছে বিশেষ প্রস্তুতি। ভোলার পুলিশ সুপার মোঃ শহিদুল্লাহ কায়সার জানিয়েছেন, থানা পুলিশ, নৌ-পুলিশ ও ট্যুরিস্ট পুলিশ সমন্বিতভাবে কাজ করছে।
সদর উপজেলা নির্বাহি অফিসার মোঃ আরিফুজ্জামার জানান উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও পর্যটকদের নির্বিঘ্ন ও নিরাপদ ভ্রমণ নিশ্চিত করতে বিভিন্ন ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় উদ্যোক্তাদের মতে, উন্নত যোগাযোগব্যবস্থা, নিরাপদ পরিবেশ, প্রাকৃতিক সৌন্দর্য এবং মানসম্মত খাবারের কারণে এখন সারা বছরই দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে পর্যটকরা ভোলায় আসছেন। ঈদের দীর্ঘ ছুটিকে ঘিরে এবার সেই সংখ্যা আরও বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
প্রকৃতির অপরূপ লীলাভূমি ভোলা যেন এবার নতুন সাজে প্রস্তুত পর্যটকদের স্বাগত জানাতে। যারা কোলাহলপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্রের বাইরে নদী, সমুদ্র, বন, চর আর নিরিবিলি প্রকৃতির মেলবন্ধনে অন্যরকম এক বাংলাদেশ দেখতে চান, তাদের জন্য এবারের ঈদে ভোলা হতে পারে এক অনন্য ভ্রমণগন্তব্য।