উপকূলীয় জনপদ ভোলার জীবন মানেই সংগ্রাম, অনিশ্চয়তা ও সীমাবদ্ধতার সঙ্গে প্রতিদিনের লড়াই। তবে সেই লড়াইয়ের ভেতর থেকেও কেউ কেউ তৈরি করেন আলোর নতুন গল্প। ভোলার সদর উপজেলার ধনিয়া ইউনিয়নের তরুণী মহিমা বেগম তেমনই এক সাহসী মুখ, যিনি দারিদ্র্য ও সামাজিক প্রতিবন্ধকতাকে পেছনে ফেলে মোবাইল প্রযুক্তি খাতে নিজেকে গড়ে তুলেছেন দক্ষ কারিগর হিসেবে।
ধনিয়া ইউনিয়নের তালুকদার বাড়ির যৌথ পরিবারে বেড়ে ওঠা মহিমার শৈশব কেটেছে অভাবের সঙ্গে লড়াই করেই। কৃষিশ্রমিক বাবার সীমিত আয়ে ১০ সদস্যের সংসার চালানো ছিল কঠিন। এসএসসি পাসের পর অর্থসংকটের কারণে থেমে যায় তাঁর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা। তবে থেমে যায়নি তাঁর স্বপ্ন।
মধ্যবিত্ত ও সংগ্রামী পরিবারের এই তরুণীর জীবনে একসময় নেমে আসে কঠিন পারিবারিক সংকট। চারপাশের পুরুষতান্ত্রিক কুসংস্কার, উপহাস আর সামাজিক প্রতিবন্ধকতা তাঁর পথ রুদ্ধ করতে চাইলেও আত্মবিশ্বাস হারাননি মহিমা। স্বাবলম্বী হওয়ার স্বপ্নই তাঁকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহস জুগিয়েছে।
সমাজের প্রচলিত ধারণা ভেঙে প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় যুক্ত হওয়ার সিদ্ধান্ত নেন মহিমা। শুরুতে ভোলার সুপরিচিত নবারণ সেন্টারের মোবাইল সার্ভিসিং প্রতিষ্ঠান ‘আকতার মোবাইল টেলিকম’-এ প্রশিক্ষণ নেন তিনি। সেখানে হার্ডওয়্যার ও সফটওয়্যার–সংক্রান্ত বিভিন্ন কারিগরি কাজ শেখার মাধ্যমে নিজের দক্ষতা গড়ে তোলেন। বর্তমানে আর শুধু প্রশিক্ষণ নয়—যে প্রতিষ্ঠানে কাজ শিখেছিলেন, সেখানেই চাকরি করছেন তিনি। মাসে প্রায় ১৭ হাজার টাকা আয় করে পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নয়নে ভূমিকা রাখছেন। একসময় যে মেয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছিলেন, আজ তিনিই পরিবারের অন্যতম ভরসা।
মহিমা জানান, পল্লী কর্ম-সহায়ক ফাউন্ডেশন (পিকেএসএফ) ও বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে গ্রামীণ জন উন্নয়ন সংস্থা (জিজেইউএস) বাস্তবায়িত “রেইজ প্রকল্প”-এর আওতায় তিনি ছয় মাসের কারিগরি প্রশিক্ষণের সুযোগ পান। পাশের বাড়ির একটি উঠান বৈঠকের মাধ্যমে তিনি এই প্রশিক্ষণের বিষয়ে জানতে পারেন। প্রশিক্ষণের শুরুতে পাঁচ দিনের “জীবন দক্ষতা উন্নয়ন বিষয়ক প্রশিক্ষণ”-এ অংশ নিয়ে উদ্যোক্তার গুণাবলি, যোগাযোগ দক্ষতা, নেটওয়ার্ক তৈরি, কুসংস্কার মোকাবিলা এবং আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিসহ নানা বিষয়ে ধারণা লাভ করেন। এই প্রশিক্ষণ তাঁর ভেতরের আত্মবিশ্বাসকে আরও শক্তিশালী করে তোলে।
মহিমা বলেন, “শুরুতে পরিবার ও সমাজের কিছু মানুষের কাছ থেকে নানা ধরনের কথা শুনতে হয়েছে। কারণ মেয়েদের এই ধরনের পেশায় কাজ করাকে অনেকে ভালোভাবে নেয় না। তবে পরিবারের সহযোগিতা ও নিজের আত্মবিশ্বাস আমাকে সামনে এগিয়ে যেতে সাহস দিয়েছে। এখন কাজ শিখে চাকরি করছি—এটাই আমার সবচেয়ে বড় অর্জন।”
মোবাইল সার্ভিসিং খাতে নারী হিসেবে মহিমার উপস্থিতি তৈরি করেছে ভিন্ন ধরনের আস্থা। বিশেষ করে নারী গ্রাহকদের বড় একটি অংশ এখনও তাঁর কাছে মোবাইল সার্ভিস করাতে বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করেন। ব্যক্তিগত ও একান্ত ব্যবহারের মোবাইল ফোন অন্যের হাতে দিতে অনেক নারী দ্বিধা অনুভব করলেও একজন নারীর কাছে সেটি তুলনামূলক নিরাপদ মনে করেন। ফলে দিন দিন মহিমার নারী গ্রাহকের সংখ্যা বাড়ছে।
বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের বিস্তার এবং সাইবার বুলিং, ব্যক্তিগত ছবি ফাঁস, ফেক আইডি ও ব্ল্যাকমেইলিংয়ের মতো ঘটনার আশঙ্কা বেড়ে যাওয়ায় নারীদের মধ্যে ডিজিটাল নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগও বাড়ছে। অনেক নারী মোবাইল সার্ভিসিং সেন্টারে গিয়ে ফোনের লক বা ব্যক্তিগত তথ্য শেয়ার করতে অস্বস্তি বোধ করেন। ঠিক সেই জায়গাতেই মহিমা হয়ে উঠেছেন ভোলার অনেক নারীর জন্য নির্ভরতার প্রতীক।
মহিমা বলেন, “অনেক নারী গ্রাহক আছেন, যারা স্বস্তি নিয়ে আমার কাছে আসেন। তারা মনে করেন, একজন নারী হিসেবে আমি তাদের ব্যক্তিগত বিষয়গুলো বুঝতে পারি। এ কারণে এখন অনেক নারী নিয়মিত আমার কাছে মোবাইল ঠিক করাতে আসেন। পাশাপাশি তারাই আবার তাদের বান্ধবী বা নিকটজনদেরও আমার কাছে মোবাইল ঠিক করানোর জন্য পাঠান।”
তিনি আরও বলেন, “নারীরা যখন আমার ওপর আস্থা রাখেন, তখন সেই বিশ্বাসটুকু রক্ষা করতে পারাটাই আমার বড় প্রাপ্তি। স্থানীয় মেয়েদের ব্যক্তিগত তথ্যের সুরক্ষায় পাশে থাকতে পারছি—এটা আমার জন্য গর্বের।”
প্রশিক্ষক সাত্তার হোসেন বলেন, “মহিমা অত্যন্ত মনোযোগী শিক্ষার্থী ছিল। নিয়মিত উপস্থিতি ও শেখার আগ্রহ তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করেছে। সে এখন চাকরি করছে এবং নিজের দক্ষতা দিয়ে মানুষের আস্থা অর্জন করছে। আমি বিশ্বাস করি, ভবিষ্যতে সে আরও সফল হবে।”
মহিমার স্বপ্ন, একদিন নিজের এলাকায় আধুনিক একটি মোবাইল সার্ভিসিং সেন্টার গড়ে তোলা। শুধু নিজের কর্মসংস্থানই নয়, সেখানে অন্য নারীদেরও প্রশিক্ষণ দিয়ে স্বাবলম্বী করে তুলতে চান তিনি। পাশাপাশি তিনি এনএসডিওর লেভেল-ওয়ান সম্পন্ন করেছেন। তাই ট্রেইনার বা সহকারী ট্রেইনার হিসেবে কাজ করারও ইচ্ছা রয়েছে তাঁর।
তিনি বলেন, “আমি চাই আমার মতো পিছিয়ে পড়া নারীরাও প্রযুক্তিনির্ভর কাজ শিখে উদ্যোক্তা হিসেবে গড়ে উঠুক। ভবিষ্যতে আমি বড় একটি সার্ভিসিং সেন্টার করতে চাই, যেখানে নারীরা নিরাপদ পরিবেশে কাজ শিখতে পারবে।”
সদর উপজেলার সমাজসেবা কর্মকর্তা মো. দেলোয়ার হোসেন বলেন, নারীদের প্রযুক্তিনির্ভর প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ বাড়ানো গেলে গ্রামীণ অর্থনীতিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। একই সঙ্গে নারীর আর্থিক স্বাধীনতা ও সামাজিক ক্ষমতায়ন আরও শক্তিশালী হবে।
জেলা মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তরের উপপরিচালক (অতিরিক্ত দায়িত্ব) মো. ইকবাল হোসেন বলেন, “প্রশিক্ষণ ও দক্ষতা উন্নয়নের মাধ্যমে প্রযুক্তি খাতে যত বেশি নারী এগিয়ে আসবেন, ততই তারা স্বাবলম্বী হবেন। এতে রাষ্ট্র, সমাজ ও দেশের অর্থনীতি উপকৃত হবে।”
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু আইন করলেই ডিজিটাল নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়; প্রযুক্তিনির্ভর পেশায় নারীদের অংশগ্রহণ বাড়াতে পারলে নারীদের জন্য আরও নিরাপদ ডিজিটাল পরিবেশ তৈরি হবে। মহিমার মতো নারী প্রযুক্তিকর্মীরা একদিকে যেমন অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছেন, অন্যদিকে নারীদের ডিজিটাল নিরাপত্তা ও আস্থার জায়গাও শক্তিশালী করছেন।
দারিদ্র্য, কুসংস্কার ও সামাজিক বাধা পেরিয়ে মহিমা বেগমের এই এগিয়ে চলা এখন ভোলার অনেক তরুণীর কাছে অনুপ্রেরণার নাম। তাঁর গল্প যেন প্রমাণ করে—সুযোগ, প্রশিক্ষণ ও দৃঢ় ইচ্ছাশক্তি একসঙ্গে থাকলে বদলে যেতে পারে জীবন, বদলে যেতে পারে সমাজও।