যুক্তরাষ্ট্রের প্রস্তাবিত শান্তি চুক্তি পর্যালোচনা করছে ইরান, যা আনুষ্ঠানিকভাবে সংঘাত অবসানের পথ খুলতে পারে। তবে মার্কিন দাবি অনুযায়ী পারমাণবিক কর্মসূচি স্থগিতকরণ ও হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলার মতো মূল শর্তগুলো এই প্রাথমিক প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত নয়। মঙ্গলবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের মুখে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেছেন, "তারা খুব দ্রুতই চুক্তি করতে চায়" এবং সংঘাত "দ্রুতই শেষ হবে"।
পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় পরিচালিত আলোচনায় ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে একটি এক-পৃষ্ঠার মেমোরেন্ডামের মাধ্যমে আনুষ্ঠানিক যুদ্ধবিরতির সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। পাকিস্তানের একাধিক সূত্র ও আলোচনায় সম্পৃক্ত অন্য একজন সূত্র রয়টার্সকে জানিয়েছে, এই প্রাথমিক চুক্তির ভিত্তিতে হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচল স্বাভাবিককরণ, ইরানের ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়া এবং ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিতে নিয়ন্ত্রণ আরোপ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা শুরু হবে।
ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন মুখপাত্র আইএসএনএ বার্তা সংস্থাকে জানিয়েছেন, তেহরান তাদের প্রতিক্রিয়া জানাবে। তবে ইরানের সংসদের শক্তিশালী পররাষ্ট্র নীতি ও জাতীয় নিরাপত্তা কমিটির মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজাই এই প্রস্তাবকে "বাস্তবতার চেয়ে বেশি মার্কিন ইচ্ছার তালিকা" বলে বর্ণনা করেছেন। ইরানের সংসদীয় স্পিকার মোহাম্মদ বাকের কালিবاف সামাজিক মাধ্যমে ইংরেজিতে লিখেছেন, "অপারেশন ট্রাস্ট মি ব্রো ব্যর্থ হয়েছে", যা মার্কিন দাবির প্রতি সন্দেহ প্রকাশ করে।
ট্রাম্প প্রশাসনের পক্ষ থেকে আলোচনা পরিচালনা করছেন বিশেষ দূত স্টিভ উইটকফ এবং প্রেসিডেন্টের জামাতা জ্যারেড কুশনার। সূত্রগুলো জানিয়েছে, যদি উভয় পক্ষ এই প্রাথমিক চুক্তিতে সম্মত হয়, তাহলে পূর্ণাঙ্গ চুক্তির জন্য ৩০ দিনের বিস্তারিত আলোচনার সময়সীমা শুরু হবে। তবে এই মেমোরেন্ডামে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর নিষেধাজ্ঞা, ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচিতে সীমাবদ্ধতা এবং মধ্যপ্রাচ্যে প্রক্সি মিলিশিয়াকে সমর্থন বন্ধ করার মতো মার্কিন মূল দাবিগুলো প্রাথমিকভাবে উল্লেখ নেই। এছাড়া ইরানের ৪০০ কেজির বেশি উচ্চ-সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুদের বিষয়টিও এই প্রস্তাবে অন্তর্ভুক্ত নয়।
বাজার প্রতিক্রিয়ায়, সম্ভাব্য চুক্তির খবরে বৈশ্বিক তেলের দাম বুধবার দুই সপ্তাহের নিম্নস্তরে নেমে আসে, ব্রেন্ট ক্রুড ফিউচার এক পর্যায়ে ১১% কমে ব্যারেলপ্রতি ৯৮ ডলারে পৌঁছায়, পরে আবার ১০০ ডলারের উপরে ওঠে। শেয়ার বাজারেও উত্থান এবং বন্ডের সুদের হারে পতন দেখা যায়, যা যুদ্ধাবসানের ইতিবাচক প্রভাবের ইঙ্গিত দেয়। জিসিই অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের সিনিয়র পোর্টফোলিও ম্যানেজার তাকামাসা ইকেদা মন্তব্য করেছেন, "মার্কিন-ইরান শান্তি প্রস্তাবের বিষয়বস্তু পাতলা, কিন্তু বাজারে এমন প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে যে সামরিক কার্যক্রম আর বাড়বে না।"
প্রেক্ষাপট: ২০২৬ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যৌথ হামলার মাধ্যমে শুরু হওয়া ইরান-যুদ্ধে হরমুজ প্রণালী অবরুদ্ধ হয়, যা বিশ্বের তেল ও গ্যাস সরবরাহের এক-পঞ্চমাংশ পরিচালনা করে। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এপ্রিল মাসে দুই সপ্তাহের যুদ্ধবিরতি চুক্তি হয়, কিন্তু তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসন পুনরায় চাপ প্রয়োগ করছে ইরানের ওপর, অন্যদিকে তেহরান নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার ও নিরাপত্তা গ্যারান্টি ছাড়া কোনো চূড়ান্ত চুক্তিতে রাজি নয়।
উদ্ধৃতি:
- ট্রাম্প: "তারা চুক্তি করতে চায়। গত ২৪ ঘণ্টায় আমাদের খুব ভালো আলোচনা হয়েছে, এবং চুক্তি হওয়া খুবই সম্ভব।"
- ইরানি সংসদীয় মুখপাত্র ইব্রাহিম রেজাই: "এটি বাস্তবতার চেয়ে বেশি মার্কিন ইচ্ছার তালিকা।"
- পাকিস্তানের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা (নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক): "আমাদের অগ্রাধিকার হলো তারা যুদ্ধের স্থায়ী অবসানের ঘোষণা দেয়, বাকি বিষয়গুলো সরাসরি আলোচনায় সমাধান করা যাবে।"
ইরান-মার্কিন শান্তি আলোচনা একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড়ে পৌঁছেছে, কিন্তু পারমাণবিক নিয়ন্ত্রণ, হরমুজ প্রণালীর নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক প্রক্সি সংঘাতের মতো জটিল বিষয়গুলো সমাধান না হওয়া পর্যন্ত স্থায়ী চুক্তি নিশ্চিত করা কঠিন। বাজার ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় পর্যবেক্ষণ করছে পরবর্তী ৩০ দিনের আলোচনার ফলাফল, যা মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা ও বৈশ্বিক জ্বালানি নিরাপত্তার জন্য নির্ণায়ক হবে।