বরিশাল বিভাগে হামের সংক্রমণ উদ্বেগজনক মাত্রায় পৌঁছেছে। বিশেষ করে বরগুনা জেলায় আক্রান্ত ও সন্দেহভাজন রোগীর সংখ্যা দ্রুত বাড়তে থাকায় পরিস্থিতি জনস্বাস্থ্যঝুঁকিতে রূপ নিচ্ছে। এ পর্যন্ত জেলায় হামে আক্রান্ত হয়ে তিন শিশুর মৃত্যুর তথ্য পাওয়া গেছে। এতে অভিভাবকদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে।
বরগুনা জেনারেল হাসপাতাল ঘুরে দেখা গেছে, হাসপাতালের আইসোলেশন ওয়ার্ডে আক্রান্ত ও উপসর্গ নিয়ে আসা শিশুদের ভিড় বেড়েছে কয়েকগুণ। শয্যা সংকটের কারণে অনেক শিশুকে মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দিতে হচ্ছে। হাসপাতাল সূত্র জানায়, এখন পর্যন্ত দেড় শতাধিক শিশু হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসা নিয়েছে। এর মধ্যে ৭৩ জনের নমুনা পরীক্ষায় ২৫ জনের শরীরে হাম এবং একজনের শরীরে রুবেলা শনাক্ত হয়েছে। বর্তমানে চিকিৎসাধীন ৩৪ রোগীর মধ্যে ৩২ জনই শিশু।
হাসপাতালে ভর্তি এক শিশুর অভিভাবক সালেহা বলেন, চার দিন আগে তার ৯ মাস বয়সী সন্তানের জ্বর শুরু হয়। পরে সর্দি-কাশি ও চোখ ওঠার উপসর্গ দেখা দিলে হাম সন্দেহে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। আরেক অভিভাবক মালেক জানান, শুরুতে স্থানীয় ফার্মেসি থেকে ওষুধ দিলেও অবস্থার উন্নতি হয়নি; বরং শরীরে লালচে র্যাশ দেখা দিলে দ্রুত হাসপাতালে নিয়ে আসেন।
চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, হামে আক্রান্ত শিশুদের মৃত্যুঝুঁকি মূলত তিন ধরনের জটিলতা থেকে তৈরি হচ্ছে—মস্তিষ্কে সংক্রমণ, মারাত্মক নিউমোনিয়া এবং দৃষ্টিশক্তি হারানোর ঝুঁকি। বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের মেডিসিন বিভাগের জুনিয়র কনসালট্যান্ট ডা. মো. আশিকুর রহমান বলেন, আক্রান্ত অনেক শিশুর ক্ষেত্রে জ্বরের পর নিউমোনিয়া দেখা দিচ্ছে, পাশাপাশি চোখ ওঠার সমস্যাও বাড়ছে।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে বরগুনা সদর উপজেলায় বিশেষ টিকাদান কর্মসূচি শুরু করেছে স্বাস্থ্য বিভাগ। প্রথম দিনেই ১ হাজার ৮৮৪ শিশু টিকা পেয়েছে। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তা ডা. অরুণাভ চৌধুরী জানান, ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী প্রায় ২৩ হাজার শিশুকে এক ডোজ করে হাম প্রতিরোধী টিকা দেওয়া হবে এবং টিকার কোনো সংকট নেই।
তবে টিকাদান বিষয়ে সতর্ক থাকার আহ্বান জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। মেডিকেল টেকনোলজিস্ট (ইপিআই) মো. এনামুল কবীর বলেন, অন্য কোনো টিকা নেওয়ার কমপক্ষে ২৮ দিন পর হাম টিকা নিতে হবে এবং হাম টিকা নেওয়ার পরবর্তী ২৮ দিনের মধ্যে অন্য টিকা দেওয়া যাবে না। অসুস্থ শিশুদের টিকা না দেওয়ার পরামর্শও দেন তিনি।
বরগুনা জেনারেল হাসপাতালের তত্ত্বাবধায়ক ডা. মো. রেজওয়ানুর আলম জানান, জেলায় মোট ৪৭টি আইসোলেশন বেড প্রস্তুত রাখা হয়েছে, যার মধ্যে ৪০টি জেনারেল হাসপাতালে। প্রতিদিন বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকেরা দুই দফা রোগী পর্যবেক্ষণ করছেন এবং নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষার জন্য ঢাকায় পাঠানো হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হাম অত্যন্ত সংক্রামক হওয়ায় শিশুদের অপ্রয়োজনে বাইরে না নেওয়া, ভিড় এড়িয়ে চলা এবং স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাই সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের প্রধান উপায়। স্বাস্থ্য বিভাগ অভিভাবকদের সচেতন থাকার পাশাপাশি নির্ধারিত টিকাদান কর্মসূচিতে শিশুদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছে।