চট্টগ্রামের মিরসরাই উপজেলার ইছাখালী ইউনিয়নের চরাঞ্চলে শনিবার (৪ এপ্রিল) বিকেলে আয়োজিত ঐতিহ্যবাহী বলিখেলায় উপচে পড়ে জনসমুদ্র। আয়োজকদের হিসাবে প্রায় ৫০ হাজার দর্শকের উপস্থিতিতে মাঠ ও আশপাশের এলাকা লোকারণ্য হয়ে ওঠে। শতাধিক বলি অংশগ্রহণকারী, ১০১টি পুরস্কার ও ঐতিহ্যবাহী 'বাঘা শরীফ'-এর উপস্থিতিতে এই আয়োজন গ্রামীণ সংস্কৃতির এক উজ্জ্বল পুনরুজ্জীবন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
মিরসরাইয়ের ইছাখালী ইউনিয়নের চরাঞ্চলে পুরোনো বেড়িবাঁধ-সংলগ্ন টেকেরহাটের বিস্তীর্ণ মাঠে শনিবার বিকেলে অনুষ্ঠিত হয় এই বলিখেলা। বিকেল গড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে চারদিক থেকে ছুটে আসা শিশু, যুবক ও বৃদ্ধ—সব বয়সী মানুষের ভিড়ে মাঠটি জনসমুদ্রে পরিণত হয়। শক্তি, সাহস ও কৌশলের এই লড়াই উপভোগ করতে স্থানীয়দের পাশাপাশি কুমিল্লা, নোয়াখালীসহ বিভিন্ন জেলা থেকে দর্শক ও অংশগ্রহণকারীরা আসেন।
প্রতিযোগিতায় শতাধিক বলি অংশ নেন। তাদের মধ্যে বিশেষ আকর্ষণ ছিলেন ঐতিহ্যবাহী আব্দুল জব্বার বলিখেলা টানা দুবারের চ্যাম্পিয়ন 'বাঘা শরীফ'। তাঁর উপস্থিতি মাঠে বাড়তি উন্মাদনা সৃষ্টি করে। কুমিল্লা থেকে আসা শাহজালাল বলি বলেন, "দীর্ঘদিন ধরে আমি এই খেলায় যুক্ত। দেশের বিভিন্ন জায়গায় আমার শিষ্যরাও অংশ নিচ্ছে। এবারের আসরে পুরস্কার জিততে পেরে আমি সন্তোষ প্রকাশ করছি।"
এবারের আয়োজনে বিজয়ীদের জন্য রাখা হয়েছিল ১০১টি পুরস্কার। ফ্রিজ, টেলিভিশন, সাইকেল, সিলিং ফ্যান, গ্যাসের চুলাসহ বিভিন্ন সামগ্রী পেয়ে উচ্ছ্বসিত হন বিজয়ীরা। প্রবাস থেকে ফিরে অংশ নেওয়া বাদশা বলি বলেন, "দেশে ফিরে আবার মাঠে নামার সুযোগ আমাকে দারুণভাবে নাড়া দিয়েছে।" প্রবীণ বলি জামাল উদ্দিন স্মৃতিচারণা করে বলেন, "একসময় এই খেলাই ছিল গ্রামের প্রধান বিনোদন।"
আয়োজক কমিটির আহ্বায়ক আব্দুল্লাহ আল নোমান ও সদস্যসচিব মীর হোসেন রাহাত জানান, এটি এ পর্যন্ত বড় আয়োজনগুলোর একটি। "গ্রামীণ ঐতিহ্য ধরে রাখতে ভবিষ্যতেও এমন আয়োজন অব্যাহত থাকবে,"—এ আশা প্রকাশ করেন তাঁরা।
বলিখেলা বাংলাদেশের উপকূলীয় ও গ্রামীণ এলাকার একটি প্রাচীন ঐতিহ্য। সময়ের প্রবাহে এই খেলা হারিয়ে যাওয়ার উপক্রম হলেও স্থানীয় উদ্যোগে তা পুনরুজ্জীবিত হচ্ছে। মিরসরাইয়ের মতো উপকূলীয় জনপদগুলোতে এমন আয়োজন স্থানীয় সংস্কৃতি চর্চা ও পর্যটন শিল্পের বিকাশে সহায়ক হতে পারে।
দর্শনার্থী মো. কামাল উদ্দিন বলেন, "এমন আয়োজন এখন খুব কম দেখা যায়। মাঠে এসে মনে হয়েছে যেন পুরোনো দিনের গ্রামীণ পরিবেশ আবার ফিরে এসেছে।" আরেক দর্শক জসিম উদ্দিন যোগ করেন, "বলিখেলা আমাদের ঐতিহ্যের একটি বড় অংশ। প্রতিযোগীদের শক্তি আর কৌশলের লড়াই খুবই উপভোগ করেছি।"
মিরসরাইয়ের এই বলিখেলা কেবল একটি ক্রীড়া আয়োজন নয়, বরং এটি গ্রামীণ ঐতিহ্যের পুনরুজ্জীবন ও সামাজিক সংহতির এক মাধ্যম। স্থানীয় প্রশাসন, সুশীল সমাজ ও আয়োজকদের সমন্বিত প্রচেষ্টায় ভবিষ্যতে এই ধরনের আয়োজন নিয়মিত হলে তা সাংস্কৃতিক ধারাবাহিকতা রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।