মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন ইরানের নেতারা যুদ্ধ শেষে চুক্তি করতে মরিয়া, অপরদিকে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি স্পষ্ট করেছেন যে যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রস্তাব তারা পর্যালোচনা করলেও কোনো ধরনের আলোচনা বা দফতরিক বৈঠকের পরিকল্পনা নেই। প্রায় চার সপ্তাহ ধরে চলমান সংঘাতের মধ্যে জ্বালানি সংকট ও মানবিক বিপর্যয় গভীর হচ্ছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প বুধবার ওয়াশিংটনে এক অনুষ্ঠানে দাবি করেন, ইরানের নেতারা "চুক্তি করতে এতটাই মরিয়া, কিন্তু তারা নিজেদের জনগণের হাতে নিহত হওয়ার ভয়ে তা স্বীকার করতে পারছে না"। তবে ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনে দেওয়া সাক্ষাৎকারে স্পষ্ট করেন, "যে বার্তাগুলো আমাদের বন্ধুপ্রতিম দেশগুলোর মাধ্যমে আদান-প্রদান হচ্ছে এবং আমরা আমাদের অবস্থান জানিয়ে বা প্রয়োজনীয় সতর্কতা জারি করে তার জবাব দিচ্ছি—এটাকে আলোচনা বা সংলাপ বলা যায় না"।
সংঘাতের প্রেক্ষাপটে, ২৮ ফেব্রুয়ারি মার্কিন-ইসরায়েলি যৌথ সামরিক অভিযানের পর ইরানের সুপ্রিম লিডার আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি নিহত হন, যা ইরানি রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ১ মার্চ নিশ্চিত করে । তার স্থলাভিষিক্ত হন পুত্র মোজতাবা খামেনি, যদিও নিয়োগের পর থেকে তাকে কোনো ছবি বা ভিডিওতে দেখা যায়নি। ইরান এরপর ইসরায়েল, উপসাগরীয় রাষ্ট্র এবং মার্কিন ঘাঁটিতে পাল্টা হামলা চালিয়েছে।
যুদ্ধবিরতির লক্ষ্যে পাকিস্তানের মাধ্যমে ইরানের কাছে পাঠানো মার্কিন ১৫-দফা প্রস্তাবে হরমুজ প্রণালী পুনরায় খোলা, উচ্চমাত্রায় সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম মজুত অপসারণ, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি সীমিত করা এবং আঞ্চলিক মিত্রদের অর্থায়ন বন্ধ করার আহ্বান জানানো হয়েছে বলে ইসরায়েলি সূত্র জানিয়েছে । হোয়াইট হাউস তবে প্রস্তাবের বিস্তারিত প্রকাশে অনিচ্ছা দেখিয়েছে।
সংঘাতের বৈশ্বিক প্রভাব তীব্র আকার ধারণ করেছে। বিশ্বের এক-পঞ্চমাংশ তেল ও এলএনজি পরিবহনের প্রধান রাস্তা হরমুজ প্রণালী কার্যত বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বিমান সংস্থা থেকে সুপারমার্কেট—সব খাতেই সরবরাহ শৃঙ্খল বিঘ্নিত হচ্ছে। আবুধাবির রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি এডিএনওসি-র সিইও সুলতান আল জাবের হরমুজ প্রণালীতে ইরানের নিষেধাজ্ঞাকে "অর্থনৈতিক সন্ত্রাসবাদ" আখ্যা দিয়ে বলেন, "যখন ইরান হরমুজকে জিম্মি করে, তখন প্রতিটি জাতিই জ্বালানি পাম্পে, মুদি দোকানে, ফার্মেসিতে মুক্তিপণ দেয়" ।
বিশ্ব খাদ্য কর্মসূচির অনুমান অনুযায়ী, জুন পর্যন্ত যুদ্ধ চললে আরও কোটি কোটি মানুষ তীব্র ক্ষুধার ঝুঁকিতে পড়বে। অন্যদিকে, শেয়ারবাজারের অস্থিরতা ও তেলের দাম বৃদ্ধি চলছে; যুদ্ধবিরতির আশা ক্ষীণ হওয়ায় বৃহস্পতিবার তেলের দাম পুনরায় ঊর্ধ্বমুখী হয়।
মার্কিন সেন্টকম প্রধান অ্যাডমিরাল ব্র্যাড কুপার দাবি করেন, যুদ্ধ শুরুর পর মার্কিন বাহিনী ইরানের ভেতরে ১০,০০০-এর বেশি লক্ষ্যে আঘাত হেনেছে এবং ইরানের বৃহত্তম নৌযানের ৯২% ধ্বংস করা হয়েছে । তবে ইরান ও আঞ্চলিক সূত্রগুলো জানাচ্ছে, কোনো চুক্তিতে লেবাননকেও অন্তর্ভুক্ত করতে হবে, যা যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের জন্য চ্যালেঞ্জ।
জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস সতর্ক করে বলেন, "বিশ্ব একটি বিস্তৃত যুদ্ধের দিকে তাকিয়ে আছে... এখন সময় এসেছে সংঘাতের সিঁড়ি বেয়ে ওঠা বন্ধ করে কূটনৈতিক সিঁড়ি বেয়ে ওঠার" । মার্কিন জনমত জরিপে ৬১% আমেরিকান ইরানে সামরিক হামলার বিরোধিতা করছেন, যা ট্রাম্প প্রশাসনের ওপর চাপ সৃষ্টি করছে।
ইরান-মার্কিন সংঘাতের কোনো দ্রুত সমাধানের লক্ষণ এখনও দেখা যাচ্ছে না। যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব পর্যালোচনার পাশাপাশি তেহরান কূটনৈতিক সংলাপের পথে এগোতে অনিচ্ছুক, অন্যদিকে ওয়াশিংটন ও তেল আভাবজনিত বৈশ্বিক চাপে সমাধান খুঁজছে। পরিস্থিতি অস্থিতিশীল থাকায় আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক নিরাপত্তা ঝুঁকি অব্যাহত রয়েছে।