বাংলাদেশ প্রাকৃতিক দুর্যোগপ্রবণ একটি দেশ। ভৌগোলিক অবস্থান, জলবায়ু পরিবর্তন এবং নদীমাতৃক পরিবেশের কারণে আমাদের দেশে প্রায়ই ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, জলোচ্ছ্বাস, নদীভাঙন, খরা ও বজ্রপাতের মতো নানা ধরনের দুর্যোগ দেখা যায়। এসব দুর্যোগে মানুষের জীবন, ঘরবাড়ি, ফসল এবং সম্পদের ব্যাপক ক্ষতি হয়। তাই দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি কমাতে জনগণের মধ্যে সচেতনতা সৃষ্টি করা এবং আগাম প্রস্তুতি গ্রহণের গুরুত্ব বোঝানোর জন্য প্রতি বছর জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস পালন করা হয়।
বাংলাদেশে প্রতিবছর ১০ মার্চ জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস পালন করা হয়। এই দিবসটির মূল উদ্দেশ্য হলো মানুষকে দুর্যোগ সম্পর্কে সচেতন করা এবং দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুত করে তোলা। দুর্যোগ কখনো আগে থেকে জানিয়ে আসে না। তাই দুর্যোগের সময় আতঙ্কিত না হয়ে সঠিকভাবে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য আগে থেকেই প্রস্তুত থাকা খুবই জরুরি। এই দিবসের মাধ্যমে জনগণকে শেখানো হয় কীভাবে দুর্যোগের আগে, সময়ে এবং পরে সঠিকভাবে কাজ করতে হয়।
এই দিবস উপলক্ষে সারা দেশে বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করা হয়। সরকারি ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক সংগঠন দিবসটি উপলক্ষে র্যালি, আলোচনা সভা, সেমিনার ও সচেতনতামূলক কর্মসূচির আয়োজন করে। স্কুল-কলেজে শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ আলোচনা, চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা এবং দুর্যোগ মোকাবিলার মহড়া অনুষ্ঠিত হয়। গণমাধ্যমেও বিভিন্ন সচেতনতামূলক অনুষ্ঠান প্রচার করা হয়। এসব কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষকে দুর্যোগের সময় কীভাবে নিরাপদ স্থানে যেতে হবে, কীভাবে নিজের ও অন্যের জীবন রক্ষা করতে হবে—এসব বিষয়ে ধারণা দেওয়া হয়।
দুর্যোগ মোকাবিলায় প্রস্তুতির গুরুত্ব অপরিসীম। আগাম প্রস্তুতি থাকলে অনেক বড় ক্ষয়ক্ষতিও অনেকাংশে কমানো সম্ভব। এজন্য আমাদের কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় মনে রাখতে হবে। যেমন—নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্র সম্পর্কে জানা, জরুরি খাবার ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা রাখা, প্রয়োজনীয় ওষুধ ও প্রাথমিক চিকিৎসার সরঞ্জাম প্রস্তুত রাখা এবং দুর্যোগের সময় সরকারি নির্দেশনা মেনে চলা। পাশাপাশি পরিবার ও প্রতিবেশীদের সঙ্গে যোগাযোগ রেখে একে অপরকে সাহায্য করা উচিত।
বাংলাদেশ সরকার দুর্যোগ মোকাবিলায় বিভিন্ন ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। ঘূর্ণিঝড় আশ্রয়কেন্দ্র নির্মাণ, আগাম সতর্কবার্তা প্রদান, উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম পরিচালনা এবং ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পুনর্বাসনের জন্য নানা উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এছাড়া স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থাও দুর্যোগ মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
জাতীয় দুর্যোগ প্রস্তুতি দিবস আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে দুর্যোগের বিরুদ্ধে লড়াই করতে হলে সবাইকে সচেতন ও প্রস্তুত থাকতে হবে। দুর্যোগের সময় শুধু সরকারের ওপর নির্ভর করলে চলবে না; প্রত্যেক নাগরিককেও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে। সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা, সচেতনতা ও প্রস্তুতির মাধ্যমে আমরা দুর্যোগের ক্ষয়ক্ষতি অনেকাংশে কমাতে পারি এবং একটি নিরাপদ ও সুন্দর বাংলাদেশ গড়ে তুলতে পারি।