সম্ভাব্য মার্কিন শুল্ক আরোপের আশঙ্কায় বৈশ্বিক তামার বাজারে বড় ধরনের সরবরাহ স্থানান্তর ঘটছে। এর প্রভাবে চীনের বন্ডেড ওয়্যারহাউসগুলো থেকে দ্রুত তামা বেরিয়ে যাচ্ছে, যা দেশটির রপ্তানি রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছে দিয়েছে বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
রয়টার্সের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গত বছর চীনের পরিশোধিত তামা (রিফাইন্ড কপার) রপ্তানি রেকর্ড পরিমাণে বেড়েছে। বিশ্বের সবচেয়ে বড় তামা আমদানিকারক দেশটি এই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে অব্যবহৃত তামার জন্য অস্বাভাবিক প্রতিযোগিতায় পড়ে।
বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রের কমোডিটি এক্সচেঞ্জ (CME)-এ তামার চুক্তিমূল্য লন্ডন মেটাল এক্সচেঞ্জের (LME) আন্তর্জাতিক দামের তুলনায় উল্লেখযোগ্য প্রিমিয়ামে লেনদেন হচ্ছে। সম্ভাব্য মার্কিন শুল্ক আরোপের কারণে এই প্রিমিয়াম তৈরি হয়েছে। শুল্ক বিষয়ে সিদ্ধান্ত জুন পর্যন্ত স্থগিত থাকলেও, এই দামের পার্থক্য বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খল থেকে তামা টেনে নিচ্ছে এবং এর প্রভাব এখন চীনের বন্ডেড ওয়্যারহাউস জোনগুলোতেও স্পষ্ট।
চীনের তামা রপ্তানি গত নভেম্বর মাসে বেড়ে দাঁড়ায় ১ লাখ ৪৩ হাজার মেট্রিক টনে। এতে করে চলতি বছরের প্রথম ১১ মাসে মোট রপ্তানি পৌঁছায় ৬ লাখ ৯৮ হাজার ৫০০ টনে, যা বার্ষিক হিসাবে নতুন রেকর্ড। এর মধ্যে শুধু নভেম্বরে ৫৭ হাজার ৭০০ টন তামা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছে, যার পুরোটা এসেছে চীনা বন্দরগুলোর বন্ডেড গুদামে থাকা মজুত থেকে।
একই সঙ্গে ইউরোপের দিকেও উল্লেখযোগ্য পরিমাণ তামা পাঠানো হয়েছে। নভেম্বরে ইতালিতে গেছে ১৬ হাজার ৫০০ টন, পাশাপাশি জার্মানি, গ্রিস ও সুইডেনেও ছোট পরিসরে চালান গেছে। মার্কিন শুল্কের অনিশ্চয়তা বৈশ্বিক বাণিজ্য প্রবাহকে বিভক্ত করে দিচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
গত বছর CME ও LME দামের ব্যবধান অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাওয়ায় ব্যবসায়ীরা যুক্তরাষ্ট্রে তামা পাঠিয়ে মুনাফার সুযোগ পান। এর ফলে CME-তে তামার মজুত বেড়ে ৪ লাখ ৫০ হাজার টনের বেশি হয়েছে, যা LME ও সাংহাই ফিউচার্স এক্সচেঞ্জের সম্মিলিত মজুতের চেয়েও বেশি। যুক্তরাষ্ট্রে সরবরাহযোগ্য চিলিয়ান তামাসহ কাঙ্ক্ষিত ব্র্যান্ডের LME মজুত প্রায় শেষ হয়ে গেছে। নভেম্বরের শেষে নিবন্ধিত মজুতে চীনা ও রুশ তামার অংশ ছিল ৯৫ শতাংশ।
চীনের বন্ডেড ওয়্যারহাউস থেকে তামা বেরিয়ে যাওয়ার এটি দ্বিতীয় ঘটনা। গত বছর ফেব্রুয়ারি থেকে জুলাইয়ের মধ্যে প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার টন তামা যুক্তরাষ্ট্রে পাঠানো হয়েছিল, যখন শুল্ক আরোপ প্রায় নিশ্চিত বলে মনে হচ্ছিল। জুলাইয়ে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প পরিশোধিত তামার বদলে কপার পণ্যের ওপর শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সেই প্রবণতা কিছুটা থেমে যায়। তবে এরপর থেকেই CME প্রিমিয়াম আবার বাড়তে শুরু করেছে।
ইউরোপসহ অন্যান্য বাজারে সরবরাহ সংকট বাড়ায় শারীরিক প্রিমিয়ামও ঊর্ধ্বমুখী। ইউরোপের বড় উৎপাদক অরুবিস চলতি বছরে টার্ম সেলের প্রিমিয়াম বাড়িয়ে প্রতি টনে ৩১৫ ডলার করেছে, যা আগে ছিল ২২৮ ডলার। চিলির রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান কোডেলকো ইউরোপীয় ক্রেতাদের জন্য ৩২৫ ডলার এবং চীনা ক্রেতাদের জন্য ৩৫০ ডলার প্রিমিয়াম দাবি করছে।
চীন এখনও বিশ্বের সবচেয়ে বড় তামা আমদানিকারক। তবে রপ্তানি বৃদ্ধির কারণে ২০২৫ সালের প্রথম ১১ মাসে বৈশ্বিক বাজার থেকে দেশটির নিট আমদানি ১১ শতাংশ কমেছে। এই সময়ে চিলি থেকে তামা আমদানি ৪৩ শতাংশ এবং পেরু থেকে ৫০ শতাংশ কমেছে। ফলে চীন ক্রমেই কঙ্গো গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্র ও রাশিয়ার ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে, যেগুলো মিলিয়ে মোট আমদানির প্রায় ৪৮ শতাংশ জোগান দিয়েছে।
রয়টার্স কলামিস্ট অ্যান্ডি হোমের মতে, সম্ভাব্য মার্কিন শুল্ক বৈশ্বিক তামা সরবরাহকে যুক্তরাষ্ট্রমুখী করে তুলেছে, যার প্রভাব চীনের বন্দরভিত্তিক মজুতসহ পুরো বাজারেই স্পষ্ট। এই প্রবণতা তামার দামের সংকেত ও মজুত পরিস্থিতি বিশ্লেষণকে আরও জটিল করে তুলছে।