ইরানে চলমান বিক্ষোভ দমনে নিরাপত্তা বাহিনী গুলি চালালে যুক্তরাষ্ট্র প্রতিবাদকারীদের পাশে দাঁড়াতে পারে—এমন হুমকি দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। কয়েক দিনের অস্থিরতায় একাধিক প্রাণহানির খবরের মধ্যেই তাঁর এই মন্তব্যে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান উত্তেজনা আরও বেড়েছে।
রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়, শুক্রবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক বার্তায় প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প বলেন, যুক্তরাষ্ট্র “লকড অ্যান্ড লোডেড”—অর্থাৎ যে কোনো পরিস্থিতিতে প্রস্তুত। তিনি স্পষ্ট করেননি, প্রতিবাদকারীদের সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র কী ধরনের পদক্ষেপ নিতে পারে।
এই মন্তব্য আসে এমন এক সময়ে, যখন ইরানে মূল্যস্ফীতি ও জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধির বিরুদ্ধে শুরু হওয়া বিক্ষোভ কয়েকটি প্রদেশে ছড়িয়ে পড়েছে এবং সংঘর্ষে বেশ কয়েকজন নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম ও মানবাধিকার সংগঠনগুলোর তথ্য অনুযায়ী, বুধবার থেকে অন্তত ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। নিহতদের মধ্যে দুজন বাসিজ আধাসামরিক বাহিনীর সদস্য বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে।
ট্রাম্পের হুমকির জবাবে ইরানের শীর্ষ কর্মকর্তা আলি লারিজানি সতর্ক করে বলেন, ইরানের অভ্যন্তরীণ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের হস্তক্ষেপ পুরো মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তুলবে। লারিজানি বর্তমানে ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কাউন্সিলের প্রধান এবং সর্বোচ্চ নেতা আয়াতুল্লাহ আলী খামেনির ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা। তিনি বলেন, “আমেরিকান জনগণের জানা উচিত—এই দুঃসাহসিকতার সূচনা করেছেন ট্রাম্পই। তাদের নিজেদের সেনাদের নিরাপত্তার দিকে নজর রাখা উচিত।”
এদিকে ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে পশ্চিম ইরানের এক স্থানীয় কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়, যেকোনো অস্থিরতা বা অবৈধ সমাবেশ “কঠোরভাবে এবং কোনো ছাড় ছাড়াই” দমন করা হবে।
শুক্রবার জাতিসংঘ মহাসচিব ও নিরাপত্তা পরিষদের সভাপতিকে লেখা এক চিঠিতে ইরানের জাতিসংঘে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূত আমির-সাঈদ ইরাভানি ট্রাম্পের বক্তব্যের নিন্দা জানাতে নিরাপত্তা পরিষদের প্রতি আহ্বান জানান। চিঠিতে তিনি বলেন, যুক্তরাষ্ট্রের এসব “অবৈধ হুমকি” থেকে সৃষ্ট যেকোনো পরিণতির সম্পূর্ণ দায় ওয়াশিংটনের ওপর বর্তাবে এবং ইরান তার অধিকার “দৃঢ় ও আনুপাতিকভাবে” প্রয়োগ করবে।
চলতি বিক্ষোভগুলো আকারে অতীতের কিছু আন্দোলনের তুলনায় ছোট হলেও, সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ায় এবং প্রাণহানির ঘটনায় সরকার চাপের মুখে পড়েছে। বিশ্লেষকদের মতে, অর্থনৈতিক সংকট ইরানের শাসকগোষ্ঠীকে আগের তুলনায় বেশি দুর্বল করে তুলছে। সর্বশেষ এই আন্দোলনটি ২০২২ সালে হেফাজতে এক তরুণীর মৃত্যুকে কেন্দ্র করে হওয়া দেশব্যাপী বিক্ষোভের পর সবচেয়ে বড় হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে, যেখানে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর মতে শতাধিক মানুষ নিহত হয়েছিল।
রয়টার্স যাচাই করা ভিডিওতে দেখা যায়, এক রাতে একটি জ্বলন্ত পুলিশ স্টেশনের সামনে লোকজন জড়ো হয়ে স্লোগান দিচ্ছে, মাঝে মাঝে গুলির শব্দ শোনা যাচ্ছে। দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলীয় শহর জাহেদানে, যেখানে বালুচ সংখ্যালঘুরা সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেখানে “স্বৈরাচারের মৃত্যু হোক” স্লোগান দেওয়া হয়েছে বলে মানবাধিকার সংগঠন হেঙ্গাও জানিয়েছে। সংস্থাটি এখন পর্যন্ত অন্তত ১৩৩ জন গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছে।
রাষ্ট্রীয় টেলিভিশন জানায়, পশ্চিমাঞ্চলীয় শহর কেরমানশাহে পেট্রোল বোমা ও ঘরে তৈরি অস্ত্র তৈরির অভিযোগে বেশ কয়েকজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে সব গ্রেপ্তার, মৃত্যু বা সংঘর্ষের খবর স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি বলে জানিয়েছে রয়টার্স।
এই উত্তেজনার পটভূমিতে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সঙ্গে ইরানের সম্পর্ক আরও জটিল হয়ে উঠছে। ট্রাম্প সম্প্রতি ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সঙ্গে বৈঠকের পর ইরানের পারমাণবিক বা ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি পুনরায় শুরু হলে নতুন হামলার হুঁশিয়ারিও দিয়েছেন। গত বছর জুনে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা, সিরিয়ায় বাশার আল-আসাদের পতন এবং লেবাননে হিজবুল্লাহর ওপর ইসরায়েলি আঘাত—সব মিলিয়ে তেহরানের ওপর চাপ বহুগুণ বেড়েছে।
এর মধ্যেই ইরানের নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট মাসুদ পেজেশকিয়ান তুলনামূলক সংযত অবস্থান নিয়েছেন। তিনি জীবনযাত্রার ব্যয় সংকট নিয়ে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে সংলাপের প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন এবং স্বীকার করেছেন যে, সংকটের পেছনে সরকারি ব্যর্থতাও রয়েছে। তবে মানবাধিকার সংগঠনগুলোর অভিযোগ, একই সময়ে নিরাপত্তা বাহিনী প্রতিবাদকারীদের ওপর গুলি চালিয়েছে।