চীনের ব্যাপক সামরিক মহড়ার পরও তাইওয়ান বুধবার উচ্চ সতর্কতা বজায় রেখেছে। আগের দিন দ্বীপটির চারপাশে রকেট, যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান নিয়ে মহড়া চালালেও চীনা জাহাজগুলো ধীরে ধীরে সরে যেতে শুরু করেছে বলে জানিয়েছে তাইওয়ানের উপকূলরক্ষী বাহিনী।
রয়টার্সের খবরে বলা হয়, “জাস্টিস মিশন ২০২৫” নামে চীনের এই সামরিক মহড়ায় তাইওয়ানের আশপাশে ডজনখানেক রকেট নিক্ষেপ করা হয় এবং বিপুলসংখ্যক যুদ্ধজাহাজ ও বিমান মোতায়েন করা হয়। এ মহড়াকে আঞ্চলিক নিরাপত্তার জন্য হুমকি এবং উসকানি হিসেবে আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানায় তাইপে।
তাইওয়ানের ওশান অ্যাফেয়ার্স কাউন্সিলের প্রধান কুয়ান বিই-লিং জানান, সামুদ্রিক পরিস্থিতি কিছুটা শান্ত হয়েছে এবং চীনা জাহাজগুলো ধীরে ধীরে এলাকা ছাড়ছে। তবে বেইজিং আনুষ্ঠানিকভাবে মহড়া শেষের ঘোষণা না দেওয়ায় জরুরি সামুদ্রিক প্রতিক্রিয়া কেন্দ্র চালু রাখা হয়েছে।
তাইওয়ানের উপকূলরক্ষী বাহিনীর এক কর্মকর্তা রয়টার্সকে জানান, তাইওয়ানের কাছাকাছি থাকা চীনের সব ১১টি কোস্ট গার্ড জাহাজ সরে গেছে। তবে নিরাপত্তা সূত্রগুলো জানায়, সামগ্রিকভাবে এখনও ৯০টির বেশি চীনা নৌ ও কোস্ট গার্ড জাহাজ দক্ষিণ চীন সাগর, তাইওয়ানের আশপাশ এবং পূর্ব চীন সাগরে মোতায়েন রয়েছে। এই সামুদ্রিক শক্তি প্রদর্শন চলতি সপ্তাহের শুরু থেকে বাড়তে থাকে বলে জানান তারা।
তাইওয়ানের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানায়, গত ২৪ ঘণ্টায় ৭৭টি চীনা সামরিক বিমান এবং ২৫টি নৌ ও কোস্ট গার্ড জাহাজ দ্বীপটির আশপাশে তৎপর ছিল। এর মধ্যে ৩৫টি সামরিক বিমান তাইওয়ান প্রণালির মধ্যরেখা অতিক্রম করে, যা দুই পক্ষের অনানুষ্ঠানিক সীমারেখা হিসেবে পরিচিত।
মহড়া চলাকালে তাইওয়ান কয়েক ডজন অভ্যন্তরীণ ফ্লাইট বাতিল করে এবং পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণে যুদ্ধবিমান ও যুদ্ধজাহাজ পাঠায়। বিভিন্ন স্থানে দ্রুত প্রতিক্রিয়া মহড়ার অংশ হিসেবে সেনাদের ব্যারিকেড বসাতেও দেখা যায়।
এদিকে, মহড়া চলার সময় নিরাপত্তা সংলাপ জোট কোয়াডভুক্ত দেশগুলোর (যুক্তরাষ্ট্র, অস্ট্রেলিয়া, জাপান ও ভারত) চীনে নিযুক্ত রাষ্ট্রদূতরা মঙ্গলবার বেইজিংয়ে বৈঠক করেন। যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত ডেভিড পারডিউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বৈঠকের ছবি পোস্ট করে কোয়াডকে “মুক্ত ও উন্মুক্ত ইন্দো-প্যাসিফিক বজায় রাখার একটি ইতিবাচক শক্তি” হিসেবে বর্ণনা করেন, তবে বৈঠকের বিস্তারিত জানাননি।
চীনের তাইওয়ান বিষয়ক দপ্তরের মুখপাত্র ঝাং হান বলেন, এ মহড়া ছিল জাতীয় সার্বভৌমত্ব ও আঞ্চলিক অখণ্ডতা রক্ষায় “প্রয়োজনীয় ও ন্যায্য পদক্ষেপ” এবং তাইওয়ানের স্বাধীনতাপন্থী শক্তি ও বাহ্যিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে “কঠোর সতর্কবার্তা”।
চীনের রাষ্ট্রীয় সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানায়, যুক্তরাষ্ট্রের রেকর্ড ১১ দশমিক ১ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্র প্যাকেজ ঘোষণার ১১ দিন পর শুরু হওয়া এই মহড়া ছিল এখন পর্যন্ত সবচেয়ে বিস্তৃত। এতে তাইওয়ানকে ঘিরে রাখার এবং বাহ্যিক শক্তিকে দূরে রাখার সামরিক সক্ষমতা প্রদর্শন করা হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, চীনের সামরিক মহড়া আগের চেয়ে আরও বাস্তবসম্মত হলেও তাৎক্ষণিক যুদ্ধ শুরুর সম্ভাবনা কম। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক থিঙ্কট্যাংক ডিফেন্স প্রায়োরিটিজের এশিয়া প্রোগ্রামের প্রধান লাইল গোল্ডস্টেইন রয়টার্সকে বলেন, “চীন প্রচুর হুমকি দেয়, কিন্তু যুদ্ধ হলে এর মূল্য তাদের জন্যও অত্যন্ত বেশি হবে।”
চীন গণতান্ত্রিকভাবে শাসিত তাইওয়ানকে নিজের ভূখণ্ডের অংশ বলে দাবি করে এবং প্রয়োজনে বলপ্রয়োগের হুমকি দিয়ে আসছে। তাইওয়ান বরাবরই এই দাবি প্রত্যাখ্যান করে আসছে।